হিন্দি সিনেমায় নারী চরিত্র যখন ‘নেগেটিভ’, তখনই সেগুলো সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। এই চরিত্রগুলো সমাজ ও সিনেমার চাপিয়ে দেওয়া নিয়ম ভেঙে দেয়। একজন নারীকে সবসময় নম্র, গ্রহণযোগ্য ও সবার মন জয় করতে হবে—এই ধারণার বিপরীতে তারা নতুন বাস্তবতা তৈরি করে।

গত কয়েক সপ্তাহে বিনোদনজগতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘ধুরন্ধর: দ্য রিভেঞ্জ’ ছবি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে চায়ের দোকান—ভারতজুড়ে এই ছবির উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এমনকি নারী ইতিহাস মাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ও এই ছবির আলোচনায় ঢাকা পড়ে যায়। কারণ ছবিটি প্রায় পুরোপুরি পুরুষকেন্দ্রিক। এতে পুরুষদের সহিংস আকাঙ্ক্ষা, দ্বন্দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই নিয়ে গড়া। বিস্ময়ের বিষয়, এখানে উল্লেখযোগ্য কোনো নারী চরিত্র নেই। কোনো ভারতীয় বা পাকিস্তানি গোয়েন্দা কর্মকর্তা, রাজনীতিক, তথ্যদাতা বা সরকারি প্রতিনিধি—নারীর উপস্থিতি যেন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত।

তবে আশার আলো আছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলো নারীদের জন্য বহুমাত্রিক চরিত্র তৈরি করছে। ‘ধুরন্ধর’ ঝড়ের কয়েক সপ্তাহ আগে মুক্তি পেয়েছিল ‘সুবেদার’ ও ‘অ্যাকিউজড’—দুটি ভিন্ন ধাঁচের ছবি। গল্প ও নির্মাণে ভিন্ন হলেও দুটিতেই এক জায়গায় মিলেছে। দুটোতেই রয়েছে অস্বস্তিকর, অধিকারবোধে ভরা নারী চরিত্র। তারা নিজেদের জীবনের মানুষদের নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং তাদের আচরণে আত্মকেন্দ্রিক ব্যক্তিত্বের লক্ষণ স্পষ্ট।

পর্দার ‘খলনায়িকা’: বদলে যাওয়া সংজ্ঞা
বলিউডে নারী খল চরিত্রের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। একসময় ‘ভ্যাম্প’ শব্দটি খুব প্রচলিত ছিল, যেখানে নারী মানেই প্রলোভন সঞ্চারক বা নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সেই যুগের সিনেমায় নারী খল চরিত্র ছিল প্রায় একমাত্রিক; তারা নায়িকার প্রতিপক্ষ বা পুরুষ চরিত্রকে বিপথে নেওয়ার মাধ্যম।

১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে নারী চরিত্ররা সাধারণত মূল খলনায়িকা হত না। হেলেন, বিন্দু ও অরুনা ইরানির মতো অভিনেত্রীদের দেখা যেত ক্যাবারে নর্তকী, গ্যাংস্টারদের সঙ্গিনী বা খলনায়িকার সহযোগী চরিত্রে। তারা নায়িকাকে অশান্ত করত, নায়ককে বিপদে ফেলত বা নায়ক-নায়িকার একত্রিত হওয়া ও খলনায়ককে পরাজিত করার পথে বাধা সৃষ্টি করত। হেলেনের মতো অভিনেত্রীরা পরতেন পশ্চিমা পোশাক, সোনালি বা তামাটে রঙের জটিল উইগ।

কিন্তু সময় বদলে গেছে। এখনকার নারী প্রতিপক্ষ চরিত্রগুলো অনেক জটিল। তারা শুধু খারাপ নয়—তাদের প্রেক্ষাপট, মানসিক টানাপোড়েন ও নিজস্ব যুক্তি আছে। অনেক সময় তারা পরিস্থিতির শিকার, আবার কখনো সচেতনভাবে নিয়ম ভাঙে।

‘খারাপ’ হওয়ার স্বাধীনতা
একজন পুরুষ চরিত্র রাগী, স্বার্থপর বা নির্মম হলে তাকে শক্তির প্রকাশ হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু নারী চরিত্রের ক্ষেত্রে একই বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে।

এখন এই ধারণা বদলাচ্ছে। নারী চরিত্রগুলো আর ‘ভালো’ হওয়ার চাপে আটকে নেই। তারা ভুল করে, অন্যায় করে, কখনো নির্মম হয়—এবং ঠিক এজন্যই তারা আরও বাস্তব ও মানবিক হয়ে ওঠে।

কিছু চরিত্র ছিল মা, শাশুড়ি বা ফুফু—যাদের কাজ নায়িকাদের জীবন দুর্বিষহ করা। লতা পাওয়ার, শাশিকালা, বিন্দু বা অরুণ ইরানি এ ধরনের বহু চরিত্রে অভিনয় করেছেন। তারা প্রায়ই সন্তান নিয়ন্ত্রণ, সম্পদ দখল বা পুত্রবধূর প্রতি অদ্ভুত নিরাপত্তাহীনতার কারণে পুত্রবধূ বা সৎবোনের জীবন নরকে পরিণত করতেন।

এ ধরনের চরিত্র দেখা গেছে ‘বেটা’, ‘জামাই রাজা’, ‘বিবি হো তো অ্যায়সি’ চলচ্চিত্রে। নব্বই দশকের শেষভাগে এবং ‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া’র পর রোমান্টিক ড্রামা সিনেমার উত্থানের কারণে মা-শাশুড়ির চরিত্রের রূপ বদলালেও। হিন্দি সিনেমায় ফেম ফ্যাটাল চরিত্রও ছিল। এই নারীরা যৌনতা ও বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করত, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করাত। উদাহরণস্বরূপ ‘কর্জ’-এ কামিনি বর্ণের চরিত্রে সিমি গারেওয়ালের অভিনয়। হিন্দি সিনেমায় এটাকে আইকনিক ফেম ফ্যাটাল হিসেবে গণ্য করা হয়।

এছাড়া ‘মকবুল’-এর ‘নিম্মি’ চরিত্রে টাবুর অভিনয় হিন্দি সিনেমার গুরুত্বপূর্ণ নারী চরিত্র। লেডি ম্যাকবেথের অনুকরণে তৈরি এই চরিত্র আব্বাজিকে (পঙ্কজ কাপুর) হত্যার জন্য মানসিকভাবে প্রভাবিত করে।

এ ধরনের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলো ‘ইশকিয়া’তে বিদ্যা বালান, ‘ফিদা’তে কারিনা কাপুর বা ‘আন্ধাধুন’ে টাবুর অভিনীত চরিত্র। এখানে নারী তার ভেতরের অন্ধকার সৌন্দর্য দিয়ে আড়াল করে।

ওটিটির উত্থান এই পরিবর্তন ত্বরান্বিত করেছে। এখানে গল্প বলার স্বাধীনতা বেশি, দর্শক নতুন কিছু খুঁজছেন। ফলে নারী চরিত্র নতুন মাত্রা পেয়েছে। ‘সুবেদার’ বা ‘অ্যাকিউজড’-এর মতো গল্পে এমন নারীদের দেখা যায়, যাঁরা নিখুঁত নন; ত্রুটিপূর্ণ, জটিল ও কখনো অস্বস্তিকর। কিন্তু এই অস্বস্তিই তাঁদের জীবন্ত করে।

নারী খল চরিত্র নিয়ে আলোচনা অসম্পূর্ণ যদি চুড়াইল, ভূতনি, পিশাচিনী ও অতিপ্রাকৃতিক সত্তার কথা না বলা হয়। ‘স্ত্রী’ ফ্র্যাঞ্চাইজি বা ‘বুলবুল’-এর চুড়াইলদের বেদনাদায়ক অতীত থাকে, যারা সেই ক্ষত থেকে প্রতিশোধপরায়ণ হয়। আবার ‘ভুল ভুলাইয়া ২’-এর মঞ্জুলিকা কালো জাদু ব্যবহার করে বোন অঞ্জুলিকাকে হত্যা করে, যে পরে প্রতিশোধী আত্মা হয়ে খল বোনকে শাস্তি দেয়।

‘মাকড়ি’-তে শাবানা আজমি, ‘এক থি ডয়েন’-এ কঙ্কনা সেনশর্মা ও ‘ব্রহ্মাস্ত্র’-এর মৌনির চরিত্রগুলো ভয়ংকর হলেও আকর্ষণীয়। বছর ধরে বলিউড ও হলিউডে জাদুকরি বা চুড়াইল চরিত্র নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। কেন নারীর চারপাশে বিপদ ও খলতার মিথ তৈরি হয়েছে, তা বোঝার জন্য। ‘স্ত্রী’, ‘বুলবুল’ বা হলিউডের ‘উইকেড’ দেখায়, এই খল চরিত্রগুলো জন্মগতভাবে খল কি জীবন-পরিস্থিতি তাদের অন্য পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে।

‘গুপ্ত’-এ কাজল, ‘কৌন’-এ উর্মিলা মাতন্ডকর অভিনীত চরিত্রগুলোতে শৈশব থেকেই ‘সমাজবিরোধী’ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আবার ‘দিল্লি ক্রাইম ৩’-এর বড় দিদি ও আম্মা চরিত্র দুটি ভুক্তভোগী, যা খল চরিত্রে রূপান্তরিত হয়েছে। এখন বলিউডের নারী প্রতিপক্ষ চরিত্র শুধু ‘ভ্যাম্প’ বা ‘খলনায়িকা’ নয়। তারা কখনো ভুক্তভোগী, কখনো বিদ্রোহী, কখনো নিছক স্বার্থপর—যেমনটি বাস্তব জীবনে দেখা যায়।

এই পরিবর্তন সিনেমার গল্প বলার ধরণকে সমৃদ্ধ করেছে এবং নারীদের উপস্থাপনাকে আরও বাস্তবসম্মত করেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে