শিশুদের ওপর ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ সহিংসতার ঘটনা রাতে ঘুমের সময় ঘটে। এই শিশুদের প্রতি চারজনের তিনজন পড়তে বা লিখতে পারে না।

‘আলাদিনের চেরাগ পেলে দৈত্যের কাছে কী চাইতে?’

‘মা–বাপেরে চাইমু, আর কিছু না। মা–বাপেরে কাম কইরা খাওয়ামু। আবার মা আমারে ভাত বাইড়া দিবো, এইডাও চাইমু’, বলছিল শিশু ইয়াসিন। গত শুক্রবার কমলাপুর রেলস্টেশনে তার সঙ্গে কথা হয়। গল্পে গল্পে সে নিজের ইচ্ছার কথা খুলে বলে।

ইয়াসিনের বয়স ১২ বছর। সে স্টেশনেই থাকে। তার বাবা মো. কালাম এবং মা মোছা. শারমিন। মা পোশাক কারখানায় কাজ করতেন, বাবা ভাঙারির দোকানে। তাঁদের ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর ইয়াসিনের আশ্রয় হয় কমলাপুর রেলস্টেশন। মা-বাবার কাছে ফিরতে চাইলেও তারা তাকে রাখতে চায় না।

ইয়াসিন স্কুলে যায় না। স্টেশনে যাত্রীদের ব্যাগ টেনে ৩০–৪০ টাকা আয় করে। এই টাকায় তার খাওয়া চলে। সে পড়তে চায়। ইয়াসিন বলে, ‘কয়দিন মজার স্কুলে গেছি। স্কুল যাইতে মন চায়। কে নিয়া যাইবো?’

আজ ১২ এপ্রিল, বিশ্ব পথশিশু দিবস। দেশে ইয়াসিনের মতো পথশিশুর সঠিক সংখ্যা জানা যায় না। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘চিলড্রেন লিভিং ইন স্ট্রিট সিচুয়েশন ইন বাংলাদেশ ২০২৪’ শীর্ষক ইউনিসেফের প্রতিবেদনে দেশে ন্যূনতম ৩৪ লাখ পথশিশু আছে বলে উল্লেখ করা হয়।

২০২৩ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ ‘পথশিশুদের ওপর জরিপ ২০২২’ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। জরিপে দেখা যায়, পথশিশুদের গড় বয়স ১২ দশমিক ৩ বছর। একজন মেয়েপথশিশুর বিপরীতে চারজন ছেলেপথশিশু। দেশের মোট পথশিশুর মধ্যে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি সাড়ে ৪৮ শতাংশ। এর মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় ৪১ শতাংশ পথশিশু বাস করে। এই শিশুদের প্রতি চারজনের তিনজন পড়তে বা লিখতে পারে না।

কমলাপুর রেলস্টেশনেই কথা হয় নয়নের (১৬) সঙ্গে। সে রাস্তায় পানি বিক্রি করে। দুই সপ্তাহ আগে তার পানি চুরি হয়ে যায়। তখন থেকে স্টেশনেই আছে। নয়ন বলে, ‘আমার বাপ–মা আছে। ম্যালাজনের বাপ–মাও নাই। পানির ট্যাকা জোগাইতে বোঝা মারতেছি। টাকা জোগাড় হইলে বাড়ি যামু।’

ইউনিসেফের জরিপে দেখা যায়, ৯১ শতাংশ পথশিশু কাজ করে। ২০ দশমিক ৯ শতাংশ বর্জ্য সংগ্রহ করে। ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ ভিক্ষাবৃত্তি ও ভিক্ষায় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করে। এছাড়া হোটেল, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, ধোয়ামোছা ও হকার হিসেবেও তারা কাজ করে।

একজন পথশিশু সপ্তাহে ১ হাজার টাকা বা ১০ ডলারের কম অর্থের জন্য ৩০ থেকে ৪০ ঘণ্টা কাজ করে। কাজের সময় ৫০ শতাংশ পথশিশু সহিংসতার শিকার হয়। পথচারীদের হাতে এই নির্যাতনের হার সবচেয়ে বেশি।

পুরানা পল্টন এলাকায় থাকে শিশু সাইদুল (১২)। তার গায়ে ময়লামাখা শার্ট, প্যান্ট দড়ি দিয়ে কোমরে বাঁধা, পায়ে ময়লা কালো আস্তর। ছোটবেলায় না বুঝে ট্রেনে উঠে কুমিল্লা থেকে ঢাকায় চলে আসে সাইদুল। আর বাড়ি ফেরা হয়নি।

সে সারাদিন বোতল কুড়িয়ে এবং নামাজের পর মসজিদের বাইরে ভিক্ষা করে। দিনে একবেলা খাওয়া জোটে। আগে সড়ক বিভাজকে ঘুমাতো, উচ্ছেদের পর নানা গলিপথে ঘুমায়। সাইদুল বলে, ‘যেহানে পাই, ওই হানেই ঘুমাই। মাইনষ্যে লাথি মারে। উঠায় দেয়। বৃষ্টির সময় বেশি কষ্ট হয়।’

পথশিশুদের ৩০ শতাংশ খোলা জায়গায় থাকে। ৭ শতাংশ সম্পূর্ণ একা ঘুমায়। শিশুদের ওপর ৩০ দশমিক ৪ শতাংশ সহিংসতা রাতে ঘুমের সময় ঘটে।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৬৪ শতাংশ পথশিশু পরিবারে ফিরতে চায় না। তবে সাইদুল বাড়ি ফিরতে চায়। সাংবাদিক শুনে তার আকুতি, ‘ভাইয়া, আমারে বাড়ি পৌঁছায় দেন। বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর। আমারে নিয়া গেলে চিনতে পারমু। আমি স্কুলে যামু, নেশা–পানিও করমু না। আমারে বাড়ি নিয়া যান।’

পুরানা পল্টন এলাকায় পাওয়া যায় শুভ, মিম, ফাতেমা, হাসান, সালাউদ্দিনদের। তারা ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল। সবাই পলিথিনে মুখ ঢুকিয়ে ডেন্ডি সেবন করছে। দলের ফাতেমার (৯) বড় বোনের সঙ্গে পথে থাকে। বোতল কুড়িয়ে দিনে ২৫০ টাকা আয়, ভিক্ষাও করে। আয়ের বড় অংশ ডেন্ডিতে যায়। তারা প্রতিদিন এক কৌটা ডেন্ডি সেবন করে, খরচ ১২০ টাকা। ফাতেমা বলে, ‘বোতল টোকায়া ভাত খাই। ভিক্ষাও করি। ডেন্ডি খাইতে চাই না। কিন্তু না খায়া ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে খাই।’

বিবিএস ও ইউনিসেফের জরিপে বলা হয়, ১২ শতাংশ পথশিশু মাদকে আসক্ত। প্রায় চার ভাগের এক ভাগ ধূমপান করে।

অধিকাংশ মানুষ পথশিশুদের অপরাধী মনে করে বলে জানান লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (লিডো) প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক ফরহাদ হোসেন। তিনি জানান, ঢাকায় পথশিশুর সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখ। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল নয়।

ফরহাদ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘তাদেরকে অপরাধী হিসেবে দেখা হয়। মানুষ মনে করে তারা মাদক পাচারের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এটি সত্যি নয়। দু–একজন টিকে থাকার খাতিরে হয়তো এসবে জড়িয়ে পড়ে। সেই দোষটা সব শিশুর ওপরে এসে পড়ে।’

বেসরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি সরকারকে এই শিশুদের সুরক্ষায় আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে বলে জানান ফরহাদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, এই শিশুদের উন্নয়নের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়। সেই অর্থ খরচ হয় না। ফেরত চলে যায়। এই শিশুদের নিয়ে কাজ করতে আন্তরিকতা জরুরি।’