যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে বসবাসকারী বাংলাদেশি পরিবারের বড়রা তাঁকে স্নেহের সাথে বলেন ‘আমাদের জুয়েল’। ছোটরা কেউ ডাকে ‘আঙ্কেল জুয়েল’, কেউ ‘আঙ্কেল হানিফ’। হাইস্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাওয়া শিক্ষার্থীদের পাশে থেকে এই আস্থা অর্জন করেছেন আবু হানিফ জুয়েল। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সানারিস টিউটোরিয়াল সেন্টারে এখন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী পড়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ বাংলাদেশি।

কুমিল্লার ছেলে আবু হানিফ জুয়েল ১৯৯৯ সালের মে মাসে, চৌদ্দ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের ওয়াল্টার রিড মিডল স্কুলে অল্প সময়ের মধ্যেই মেধার পরিচয় দেন। পরের বছর গোল্ড প্রেসিডেনশিয়াল অ্যাওয়ার্ড পান। এরপর নর্থ হলিউড হাইস্কুলে ভর্তি হন। ২০০৪ সালে হায়েস্ট অনার রোল নিয়ে পড়াশোনা শেষ করেন। তখন থেকেই ‘ভালো ছাত্র’ হিসেবে তাঁর খ্যাতি ছড়াতে শুরু করে।

শৈশবে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখেননি হানিফ। কিন্তু হাইস্কুলে পড়াকালীন সহপাঠীরা গণিতের জটিল সমস্যায় আটকে গেলে ধৈর্য ধরে তাদের বুঝিয়ে দিতেন। এভাবে ধীরে ধীরে শিক্ষকতার প্রতি আগ্রহ জন্ম নেয়। একদিন প্রি ক্যালকুলাস শিক্ষক বলেন, “হানিফ, তুমি গণিতের ভাষা অনুবাদ করতে পারো। তুমি একদিন অসাধারণ শিক্ষক হবে।” এই কথাই তাঁর জীবনের দিক পরিবর্তন করে দেয়। তিনি বুঝতে পারেন, কোন পথে এগোতে চান।

হাইস্কুল শেষে ক্যালিফোর্নিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটি, নর্থরিজে ভর্তি হন। চার বছরের ইন্টিগ্রেটেড প্রোগ্রামে একই সঙ্গে ব্যাচেলর ডিগ্রি ও টিচিং ক্রেডেনশিয়াল অর্জন করেন। ক্যাম্পাসের ম্যাথ ল্যাবে পেইড টিউটর হিসেবে কাজ করতেন। ক্লাসের ফাঁকে, সন্ধ্যায় বা সপ্তাহান্তে বিভিন্ন জায়গায় শিক্ষার্থীদের পড়াতেন। কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো কফি শপে, কখনো নিজের বাড়িতে। এতে নর্থ হলিউডের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে তাঁর পরিচিতি বাড়তে থাকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠী ও শিক্ষকেরা এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দেন। গ্ল্যাডিস বাইরাম স্কলারশিপসহ বেশ কয়েকটি একাডেমিক পুরস্কার পান।

২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করেন হানিফ। তখন বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষকতার চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ২০০৯ সালে বিয়ে করেন। নতুন দায়িত্ব নিয়ে একাধিক কাজের পাশাপাশি টিউটরিং চালিয়ে যান।

২০১১ সালে প্রয়াত সেলিম চৌধুরীর সহায়তায় লস অ্যাঞ্জেলেসের লিটল বাংলাদেশ এলাকায় সেফালন টিউটোরিয়াল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১৩ সালে এর নাম রাখেন সানারিস টিউটোরিয়াল সেন্টার। কোরিয়ান, চীনা, ফিলিপিনো, ভারতীয়, পাকিস্তানি, ইথিওপিয়ান, মঙ্গোলিয়ান, লাতিনোসহ বিভিন্ন দেশ ও সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী এখানে পড়ে। এই কেন্দ্র থেকে শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে অনেকে।

শুধু শিক্ষকতা করেই হানিফ এখন মাসে আয় করেন ১০ থেকে ১৫ হাজার ডলার (১২ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা)। ২০২৩ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসে আনন্দ মেলার পক্ষ থেকে তাঁকে ‘আউটস্ট্যান্ডিং সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’ দেওয়া হয়। বাংলাদেশি কমিউনিটির শিক্ষা ও সমাজে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা।

হানিফ বলেন, “টিউটরিং এখন আমার আনন্দ। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে সাফল্যের পথে নিয়ে যেতে চাই।”

এই পথচলায় পাশে থাকার জন্য বাবা এ বি এম আবদুর রশীদ খান, মা ফাতেমা বেগম এবং স্ত্রী নিগার সুলতানার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।