তথাকথিত অনুপ্রবেশ রোধে ভারতের বিজেপি সরকারের প্রভাবশালী নেতা অমিত শাহ বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুমির ও সাপ ছাড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। এই ঘোষণা পড়লে যুক্তরাজ্যের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ও যুদ্ধোত্তর প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের কথা মনে পড়ে যায়।

ভারতের মানুষ ও সমাজ নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্যে চার্চিলের তুলনা ছিল না। তিনি আক্ষেপ করে বলতেন, ভারতীরা একটি পশুর জাত, তাদের ধর্ম পশুধর্ম। ভারতীয় ও ভারতের প্রধান ধর্ম নিয়ে তিনি নির্দ্বিধায় অপমানজনক মন্তব্য করেছেন। মহাত্মা গান্ধীকে তিনি প্রকাশ্যে ‘ন্যাংটা ফকির’ বলতেন। তিনি বলেছেন, ‘ভাবতেই আমার গা ঘিনঘিন করে যে একটি ন্যাংটা ফকির ভাইসরয়ের প্রাসাদের সিঁড়ি বেয়ে উঠছে।’

ভারতে দুর্ভিক্ষ চলাকালীন বাংলায় কাতারে কাতারে মানুষ মারা যাচ্ছিল, তখন চার্চিল চুরুট ফুকতে ফুকতে বলেছিলেন, ‘খরগোশের মতো সন্তান জন্ম দিলে দুর্ভিক্ষ তো হবেই।’

এসব মন্তব্যের পেছনে ছিল চার্চিলের ঔপনিবেশিক দম্ভ। কিন্তু সময় গড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসে এগুলো তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। সকলে এখন বুঝতে পারেন, এসব ছিল তাঁর ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি–লালিত্যপূর্ণ দম্ভপ্রকাশ।

চার্চিলরা আছেন

মানুষকে তাচ্ছিল্য করে পশুর সঙ্গে তুলনা করা রাজনীতিবিদদের প্রাচীন কৌশল। অ্যাডলফ হিটলার নাৎসি প্রচারণায় ইহুদিদের ইঁদুর, পরজীবী বলতেন। ওসমানীয় শাসকগোষ্ঠী আর্মেনীয়দের বিরুদ্ধে প্রচারণায় তাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ ও ‘রোগ’ হিসেবে চিত্রিত করত। সার্ব জাতীয়তাবাদী প্রচারণায় বসনিয়ার মুসলিমদের বিদেশি শত্রু তুর্ক, মৌলবাদী বলা হতো। উপনিবেশকালে ইউরোপীয় শাসকেরা আফ্রিকা ও এশিয়ার মানুষদের স্যাভেজ (অসভ্য বা জঙ্গলি) বলতেন। ব্রিটিশ, ফরাসি, বেলজিয়ান উপনিবেশে এ ভাষা প্রচলিত ছিল। শোষণ ও দমনকে বৈধ করতে সভ্য বনাম অসভ্যের বিভাজন তৈরি করা হতো। সভ্য শ্বেতাঙ্গ শাসকদের তখন অসভ্যদের মানুষ করার পবিত্র দায়িত্ব পড়ত। এরই নাম উপনিবেশ।

কিছু রাজনৈতিক আদর্শ বা নেতা বিশ্বাস করেন, অপছন্দের বা অধীন জনগোষ্ঠীকে বন্য প্রাণী বা কীটপতঙ্গের সঙ্গে তুলনা করলে তাদের শোষণ বা নির্মূল সহজ হয়। ‘ওরা মানুষের পর্যায়ে পড়ে না’–এই ধারণা এক জনগোষ্ঠীকে অন্যায় করে, তাদের প্রতি সহমর্মিতা নষ্ট করে। তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা তখন বৈধ মনে হয়। এতে ‘আমরা বনাম তারা’ বিভাজন গড়ে ওঠে।

সমাজবিজ্ঞানীরা একেই বলেছেন ডিহিউম্যানাইজেশন বা অমানবিকীকরণ। রাজনীতিতে বর্জন, অধঃস্থানকরণ, আক্রমণ, মেরুকরণ বা গণহত্যার আগে কোনো জনগোষ্ঠীকে পশু বা পোকামাকড়ের সঙ্গে তুলনা করে অমানবিকীকরণ করা হয়েছে ইতিহাসে বহুবার।

এটা কেন বিপজ্জনক

কোনো জনগোষ্ঠীকে পশু বা কীটপতঙ্গ হিসেবে দেখালে তাদের প্রতি সহমর্মিতা কমে যায়। পোকা মারার মতো তাদের পিষে ফেলা বৈধ মনে হয়। ইতিহাস দেখায়, অমানবিকীকরণের ভাষা শুধু কথা নয়, বড় সহিংসতা বা দমননীতির পূর্বাভাস। এমনকি হত্যার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। যেমন ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় হুতুরা বেতার-টেলিভিশনে তুতসিদের ইনয়েনজি বা তেলাপোকা বলে প্রচার চালিয়ে হত্যার সম্মতি উৎপাদন করেছিল।

ভারতীয়দের নিয়ে চার্চিলের কটূক্তি নিয়ে ব্রিটেনের কিছু রাজনীতিবিদ, যেমন লিও আমেরি বলেছিলেন, ‘চার্চিল আর হিটলারের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আমি কখনো কোনো ফারাক খুঁজে পাইনি।’ ভারতীয়দের মধ্যেও তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছিল। তাই আশা করা যেত, ইংরেজ বিদায়ের পর স্বাধীন ভারতের রাজনীতিবিদরা ইতিহাস থেকে শিখবেন। তাঁরা চার্চিলের আদর্শশ্রেষ্ঠত্বের ধারণায় অন্ধ হয়ে ভিন্ন আদর্শ, বিশ্বাস বা পরিচয়ের মানুষদের তুচ্ছ করবেন না বা উত্তেজনাপূর্ণ ভাষা ব্যবহার থেকে বিরত থাকবেন।

২০১৮-২০১৯ সালের দিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ভাষণে ভারতে ক্ষমতাসীন দলের নেতা অমিত শাহ বলতে থাকেন, ‘অনুপ্রবেশকারীরা উইপোকার মতো…তাদের এক এক করে তুলে বের করে দেওয়া হবে।’ যদি রাজনীতির লাঠিয়ালেরা এই ভাষাকে ব্যাখ্যা করে যে উইপোকার মতো মানুষদের নিষ্পিষ্ট করা বৈধ, তাহলে ঠেকাবে কে?

মুক্তকণ্ঠর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানাচ্ছেন (৬ এপ্রিল ২০২৬), তথাকথিত অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে কুমির ও সাপ ছাড়ার প্রস্তাব করেছেন ভারত সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী। উত্তর ভারতে লেপ–তোশকের ছারপোকা মারতে পিঁপড়ার ব্যবহার পুরোনো কৌশল। তথাকথিত অনুপ্রবেশকারীদের তো আগেই উইপোকা বলে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। এখন কি তবে বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে ‘উইপোকা’ মারতে সাপ–কুমিরের ব্যবহার হবে? 

শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির জনতুষ্টিমূলক বচন সেই রাজনীতির ভোক্তার মনে প্রবল উগ্রতা তৈরি করে। তাদের এটা মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় যে উইপোকাদের নির্মূল করাই কর্তব্য। কাঁটাতারের বেড়া, ড্রোন, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম মারফত নজরদারির পাশাপাশি ‘অনুপ্রবেশ’ রোধে সীমান্তবর্তী নদী ও জলাভূমিতে কুমির ও সাপ ছাড়ার ভাবনা সেই কর্তব্য পালনে উগ্রবাদী জনতাকে উসকে দিতে পারে।

মানুষ বা যেকোনো প্রাণীর প্রাণনাশের বাসনায় জলাভূমি আর নদীতে ইচ্ছা করলেই কি আমরা বিষধর সাপ আর মানুষখেকো কুমির ছাড়তে পারি? প্রভু, নতুন যুগের চার্চিলের ছায়া থেকে আমাদের মুক্ত করো।