‘পিআইসিইউতে মেয়েটা আমার অপেক্ষাতেই ছিল। অন্যদিকে ফিরে ছিল। হাত দুটো বাঁধা ছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখে হাত দুটো যতটুকু উঁচু করা যায়, তা করে বলল, “বাবা আমাকে বুকে নাও। আমাকে পানি দাও।” চিকিৎসক কাছে যেতে নিষেধ করলেন। মেয়েকে বুকে নিতে পারলাম না, পানি দিতে পারলাম না।’
আল আমিনের ৪ বছর ৩ মাস বয়সী মেয়ে আকিরা হায়দার আরশির কাছে এটাই ছিল শেষ আবদার। এখনো বাবা বিশ্বাস করতে পারছেন না যে তাঁর কলিজা আর নেই।
১ এপ্রিল দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে ডা. এম আর খান শিশু হসপিটাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউট অব চাইল্ড হেলথের শিশুদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) বাবা-মেয়ের শেষ কথা হয়। লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় ২ এপ্রিল রাত আটটার পর চিকিৎসকেরা আকিরাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া মৃত্যুসনদে রোগ বা মৃত্যুর কারণ হিসেবে হামের সঙ্গে শ্বাসযন্ত্রের প্রদাহ, সারা শরীরে জীবাণু সংক্রমণ এবং হৃদযন্ত্রের জন্মগত সম্ভাব্য ত্রুটির উল্লেখ আছে। হাম কী, কেন ও কীভাবে ছড়ায় এবং শিশুর হাম হলে করণীয় জানাচ্ছেন শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ।
আল আমিন জানান, এই হাসপাতাল ছাড়াও ডেলটা হাসপাতাল ও গ্লোবাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিউমোনিয়া, হামসহ নানা জটিলতায় পাঁচ দফায় ২৭ দিন ভর্তি ছিল মেয়ে।
আল আমিন একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। স্ত্রী সানজিদা হক, মেয়ে আকিরা ও ১৫ মাস বয়সী ছেলে আদিয়ান হায়দারকে নিয়ে মিরপুরের টোলারবাগে থাকেন। কাছাকাছি দূরত্বে শ্বশুরের বাসায় বসে গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আল আমিনের সঙ্গে কথা হয়। মেয়ে মারা যাওয়ার পর স্ত্রী ও ছেলেকে রেখে মাদারীপুরের নিজ বাড়িতে চলে এসেছেন। শ্বশুরের বাসাও খালি। দুই পরিবারের প্রথম নাতনি হিসেবে খুব আদরের ছিল আকিরা।
আল আমিন বলেন, ‘দুই দিন আগে মাদারীপুর থেকে ঢাকায় আসলাম। ঘরের চারপাশে মেয়েটার স্মৃতি। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমিও বাড়ি চলে যাব।’
নানির বাসায় আকিরার জামাকাপড়, বড় পুতুল, মেকআপ বক্সসহ খেলনা ছড়িয়ে আছে। হাসপাতালে বসেই খেলনার বায়না করেছিল। খেলনা স্টেথোস্কোপ, গোলাপি রঙের মোটরবাইক, গিটার কেনা হয়েছিল। হাসপাতালের বিছানায় বসে এগুলো দিয়ে খেলেছে আকিরা। মেয়ের ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন বাবা। এগুলো দেখে কান্নাকাটি করছিলেন তিনি।
‘আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দেও আল্লাহ’, হঠাৎ এক মায়ের আহাজারিতে স্তব্ধ হাম ওয়ার্ড।
টোলারবাগে আল আমিনের শ্বশুরের ফ্ল্যাটের ওপরের ফ্ল্যাটে আকিরার খালা পুষ্পিতা হক থাকেন। তিনি আকিরার জন্য কেনা ঈদের জামার প্যাকেট খুলে দেখালেন। জামার দাম লেখা ট্যাগও খোলা হয়নি। মিরপুরের একটি মার্কেট থেকে আকিরার বাবা জামাটি কিনেছিলেন, ভিডিও কলে আকিরা নিজেই পছন্দ করে; কিন্তু এটি আর পরা হয়নি। ২১ মার্চ ঈদের দিনও আকিরা ছিল হাসপাতালে। ৮ মার্চ থেকেই আকিরার বেঁচে থাকার লড়াই শুরু হয়েছিল।
আল আমিনের দাদা, দাদি, বাবা, মা সহ পরিবারের অন্যরা সবাই বেঁচে আছেন। মাদারীপুরের পারিবারিক কবরস্থানে একা শুয়ে আছে আকিরা। বলছিলেন আল আমিন।
ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ভোগান্তির শুরু
৮ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে মেয়েকে নিয়ে দৌড়াতে হয়েছে আল আমিনকে। ঠান্ডা, জ্বর, কাশি নিয়ে প্রথম ভর্তি। তারপর নিউমোনিয়ার চিকিৎসা শুরু। শেষ পর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, আকিরার হাম হয়েছে। এক হাসপাতালে অক্সিজেন নেই, অন্যটিতে পিআইসিইউ নেই। দুই দফায় ভর্তি হয় এম আর খান শিশু হাসপাতালে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে অভিভাবকদের যুদ্ধ।
আল আমিন বলেন, ‘আমার মনে হয়, এম আর খান শিশু হাসপাতাল থেকেই আকিরার হাম হয়েছিল। মেয়ে এ হাসপাতালের ওয়ার্ডে ছিল দীর্ঘ সময়। তখন হামে আক্রান্ত অন্য শিশুরাও এ ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল। প্রথম থেকে এ ভয়টাই পাচ্ছিলাম।’
বাবা বলেন, ‘হাসপাতালে মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো অবস্থায়ও মেয়েটা আমার বুকে শুয়ে থাকত। আমার হাতটা ধরে থাকত। সেই হাতটা ছেড়ে চলে গেল।’
আল আমিন জানান, ৬ মার্চ আকিরার হালকা কাশি ও জ্বর ছিল। ভেবেছিলেন, ঋতু পরিবর্তনের জন্য। পরে জ্বর ও কাশি বাড়ে। এর মধ্যে ছোট ছেলেরও জ্বর ও ডায়রিয়া হয়। ৮ মার্চ হাসপাতালে ছেলেকে ভর্তি করতে নেওয়া হয়। তখন আকিরার বুকের এক্স-রে হয়। চিকিৎসক জানান, নিউমোনিয়া হয়েছে। পরে ছেলে-মেয়েকে ডা. এম আর খান হাসপাতালে ভর্তি। ছেলে ১৯ মার্চ পর্যন্ত ভর্তি ছিল। ১৪ মার্চ আকিরা ছুটি পায়। বাসায় ফিরে আবার জ্বর। আবার ভর্তি। ১৭ মার্চ থেকে ঈদের ছুটিতে চিকিৎসক স্বল্পতায় ভোগান্তি বাড়ে। ২৪ মার্চ শ্বাসকষ্ট শুরু। জ্বর বাড়ে। মুখে ঘা, খেতে পারে না। শরীরে র্যাশ, চোখ লাল, ফুসফুসে পানি, রক্তে সংক্রমণ। তিনটি হাসপাতালে ঘুরতে হয়।
হাসপাতালে ভর্তির পর দুই ছেলে-মেয়ের পেছনে সব মিলে খরচ হয়েছে তিন লাখ টাকার বেশি। আল আমিনের অফিসের পাশাপাশি স্বজনেরা সহায়তা করেছেন। ধারদেনা করতে হয়েছে।
আক্ষেপ করে আল আমিন বলেন, ‘চেষ্টার কোনো কমতি করিনি। টাকা আরও লাগলে খরচ করতাম। শুধু চেয়েছিলাম, মেয়েটা বেঁচে থাকুক। পৃথিবী একদিকে আর আমার মেয়েটা ছিল আরেক দিকে। মেয়ের সব বায়নাও ছিল আমার কাছে। যত কষ্টই হোক মেয়ের সব আবদার পূরণ করার চেষ্টা করেছি। কিন্তু...।’
জন্মের পর আকিরার অন্য টিকাগুলো দেওয়া হলেও হামের টিকা (এমআর ভ্যাকসিন) বাদ পড়ে গিয়েছিল। আল আমিন বলেন, ‘এটা অবশ্যই আমাদের বড় ভুল ছিল, গাফিলতি ছিল। এখন মনে হচ্ছে, এই টিকা দেওয়া থাকলে হয়তো মেয়েটা বেঁচে যেত। অন্য মা–বাবাকে বলব, টিকার বিষয়ে কোনো গাফিলতি করবেন না।’
মেয়েকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন আল আমিন। হলুদ রঙের স্কুলব্যাগ কিনে দিয়েছিলেন। প্লাস্টিকের প্যাকেটবন্দী ঈদের জামা, খেলনা, বিভিন্ন বায়না—সব এখন স্মৃতি।
আল আমিনের একটাই চাওয়া। হামসহ যেকোনো অসুখে আর কোনো মা–বাবার বুক যেন খালি না হয়। হাসপাতালগুলোতে অক্সিজেন, পিআইসিইউসহ যা লাগে সব থাকুক। চিকিৎসকেরা আরেকটু মানবিক হবেন। সন্তানকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়াতে না হয় এমন ব্যবস্থা থাকবে।






