ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চরঈশ্বরদিয়া গ্রামের গৃহবধূ কারিমা আক্তার। তার আট মাস বয়সী মেয়ে নুসাইবাকে ৪ এপ্রিল ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। শিশুর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হওয়ায় আইসিইউ সাপোর্টের প্রয়োজন হয়। কিন্তু হাসপাতালে শিশুদের আইসিইউ নেই। এমন পরিস্থিতিতে বুধবার (৮ এপ্রিল) থেকে চিকিৎসকরা ‘বাবল সিপ্যাপ’ পদ্ধতিতে শিশুর ফুসফুসে অক্সিজেন সরবরাহ করে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনেন।
হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে হামের লক্ষণ নিয়ে রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। শিশুদের জন্য আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে তা চালু হয়নি। আইসিইউ না থাকায় চিকিৎসকরা হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের শিশুদের চিকিৎসায় বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ওয়ার্ড ঘুরে দেখা গেছে, সন্তান নিয়ে বাবা-মায়েরা ব্যাকুল। শিশু নুসাইবার মা কারিমা আক্তার বলেন, “বাচ্চা যদি আইসিইউয়ে থাকত, তাহলে দ্রুত ভালো হইত। এখন বোতল দিয়ে একটি যন্ত্র তৈরি করে দিছে তারা (চিকিৎসক)।”
ওয়ার্ডে দেখা যায়, প্লাস্টিকের পানির বোতল দিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে যন্ত্র তৈরি করা হয়েছে। এটি শিশুর শয্যার নিচে রাখা। বোতলে পানি ভরা এবং একটি নল লাগানো। এই নলের মাধ্যমে হাসপাতালের কেন্দ্রীয় অক্সিজেন সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত করে শিশুর নাকে অক্সিজেন প্রবেশ করানো হচ্ছে।
শিশুদের আইসিইউ না থাকায় হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন শিশুরা যখন অতিরিক্ত শ্বাসকষ্টে পড়ে এবং আইসিইউ-এর মতো অবস্থা হয়, তখন বিকল্প হিসেবে বাবল সিপ্যাপ ব্যবহার করা হয়। এ কথা জানান ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার ও হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বাধীন চিকিৎসক মাজহারুল আমিন। তিনি বলেন, বাবল সিপ্যাপ তৈরির প্রশিক্ষণ সরকার দিয়েছে এবং যন্ত্র সরবরাহ করেছে। নির্দেশনা মতো যাদের অতিরিক্ত শ্বাসকষ্ট এবং স্বাভাবিক অক্সিজেনে স্যাচুরেশন কমে যায়, তাদের বাবল সিপ্যাপ দেওয়া হয়।
চিকিৎসক মাজহারুল আমিন বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, বাবল সিপ্যাপ দেওয়ার পর বাচ্চার রেসপন্স (সাড়া) খুব ভালো। বেশ কয়েকটি বাচ্চা অনেকটা সুস্থের পথে। আমাদের যা পর্যবেক্ষণ, তা হলো ভর্তি থাকা শিশুদের মধ্যে সাত থেকে আট বাচ্চা আইসিইউয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় রয়েছে। তাদের বাবল সিপ্যাপ দেওয়ায় অনেকটা শ্বাসকষ্ট কমে আসছে। দুই–একটা বাচ্চা ক্রিটিক্যাল থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভালোর দিকে।”
‘আমার বুকের ধনরে ফিরায়া দেও আল্লাহ’—এক মায়ের আহাজারিতে হাম ওয়ার্ড স্তব্ধ। ময়মনসিংহ সদর উপজেলার চুরখাই বেলতলী গ্রামের স্বপন মিয়া ও চম্পা আক্তার দম্পতির চার কন্যাসন্তানের পর ৩ মাস ১১ দিন আগে পুত্রসন্তান হয়। ঠান্ডা ও হামের উপসর্গে গত ৩১ মার্চ শিশুটি হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়। এই শিশুকেও বাবল সিপ্যাপ পদ্ধতিতে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছে। মা চম্পা আক্তার বলেন, “হাসপাতালে ভর্তির পর হঠাৎ শ্বাসকষ্ট বাইড়া গেছে। তাদের (হাসপাতাল) যে অক্সিজেন, এইডা দিয়া লোড পায় না। পরে তারা (চিকিৎসক) বুদ্ধি কইরা একটা যন্ত্র বানায়া তিন দিন ধইরা অক্সিজেন দিতাছে।”
চম্পা আক্তার আরও বলেন, “তারা (চিকিৎসক) বলছিল ঢাকায় আইসিইউয়ে নিয়ে যান, কিন্তু খবর নিয়া দেখছে সিট খালি নাই, সব ফিলাপ হইয়া গেছে। বাচ্চারে তো বাঁচানি লাগব, এই কান্নাকাটি করলে স্যারেরা মিইলা এই মেশিন বানায়া অক্সিজেন দিতাছে। আইসিইউ থাকলে আমার ছেলে আরও আগে সুস্থ হইত।”
জেলার ফুলপুরের রহিমগঞ্জ ইউনিয়নের চকঢাকিরকান্দা গ্রামের স্বপ্না আক্তার ৯ মাস বয়সী ছেলে সোহানকে নিয়ে ২২ মার্চ থেকে ভর্তি। এই শিশুকেও বাবল সিপ্যাপ দিয়ে অক্সিজেন সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বপ্না আক্তার বলেন, “ঠান্ডা, নিউমোনিয়া ও হামে আক্রান্ত ছেলে। ১০ থেকে ১২ দিন ধরে খারাপ অবস্থা। কী করব, কোনো দিশা পাচ্ছি না।”
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে এক-দুজন করে হামের লক্ষণ নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগে ভর্তি শুরু হয়। মার্চের মাঝামাঝি থেকে রোগী সংখ্যা বাড়তে থাকে। হামের লক্ষণ নিয়ে আসা শিশুদের চিকিৎসায় তিনটি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে গতকাল সকাল আটটা থেকে আজ সকাল আটটা পর্যন্ত ২৬ শিশু নতুন ভর্তি হয়েছে। ৬৪ শয্যার (প্রতি শয্যায় দুজন শিশু ধরে) ওয়ার্ডে বর্তমানে ৭৬ শিশু চিকিৎসাধীন। ১৭ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামের লক্ষণ নিয়ে মোট ৩২৪ শিশু ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ২৩৯ জন ছাড়া পেয়েছে এবং ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৬ শিশু সুস্থ হয়ে ছাড়া পেয়েছে।
জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় জানিয়েছে, আজ পর্যন্ত ১৭২ শিশুর নমুনা ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং এর মধ্যে ৭০ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
হাসপাতালের হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডের ফোকাল পারসন মোহা. গোলাম মাওলা বলেন, করোনার সময় শিশুদের জন্য ছয় থেকে আট শয্যার আইসিইউ ওয়ার্ড প্রস্তুত করা হলেও যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে তা চালু হয়নি। বিভিন্ন সময় চাহিদা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে, গত সপ্তাহেও পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সন্দেহজনক হামের রোগী ভর্তি বাড়ছে।
আইসিইউ প্রয়োজনীয় এক রোগী গত কয়েকদিন আগে ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। গোলাম মাওলা বলেন, “জরুরি ভিত্তিতে আইসিইউ লাগবে, এমন রোগী এখন না থাকলেও শ্বাসকষ্টের রোগীদের অক্সিজেন ও বাবল সিপ্যাপ দিয়ে সাপোর্ট দিচ্ছি। সিলিন্ডারে অনেক সময় কাজ না হওয়ায় বাবল সিপ্যাপ দিয়ে অক্সিজেন ব্যালান্স করা হয়। যারা মারা যাচ্ছে, তাদের অপুষ্টি ও হামের পাশাপাশি অন্য কোনো উপসর্গও রয়েছে।”






