টোকিওর একটি রেস্তোরাঁয় উত্তেজিতভাবে বসে আছেন তিন পুরুষ ও তিন নারী। তারা একে অপরের অচেনা হলেও সবার মধ্যে একটি মিল আছে—একই পদবি।

কিছুক্ষণ পর তাদের দুজন করে বুথে বসানো হবে। একে অপরের সঙ্গে পরিচয় করার জন্য পাবেন ১৫ মিনিট সময়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক হাসিমুখে বললেন, ‘চলুন, সুন্দর একটা হাসি ও হ্যালো দিয়ে শুরু করা যাক।’

এখানে আলাপের সময় কারও পদবি জিজ্ঞাসা করার দরকার নেই, কারণ সবারই পদবি এক—সুজুকি। এই অভিনব আয়োজনের পেছনে জাপানের একটি বিতর্কিত আইন। দেশটির আইন অনুযায়ী, বিয়ের পর স্বামী–স্ত্রীকে একই পারিবারিক নাম বা পদবি ব্যবহার করতে হয়। এই নিয়ম এড়াতে একই পদবির মানুষদের একত্রিত করা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীরা একটি অ্যাপের মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে আড্ডা শুরু করেন। প্রথম রাউন্ড শেষে পুরুষদের পরের টেবিলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একটি টেবিল থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসে। আরেক টেবিলে এক যুগল স্পনসর কোম্পানির কেক ও বিস্কুট নিচ্ছেন, যাদের নামের শেষে সুজুকি পদবি যুক্ত।

শুধু সুজুকি নয়, ইতো, তানাকা ও সাতো পদবির মানুষদের জন্যও এ ধরনের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা আছে। ৩৪ বছর বয়সী নার্স হানা সুজুকি বলেন, ‘বিয়ের পর নিজের আগের নাম ধরে রাখার বিষয়ে আমার খুব একটা জেদ নেই। কিন্তু আরেকজন সুজুকির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার এই ব্যাপার আমার কাছে খুব মজার মনে হয়েছে।’

জাপানের দেওয়ানি আইন বলছে, বিয়ের পর স্বামী–স্ত্রীকে অবশ্যই একই পারিবারিক নাম বা পদবি ব্যবহার করতে হবে। বিয়ের পর তাঁরা কার পদবি বেছে নেবেন, সে স্বাধীনতা তাঁদের আছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে, প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে নারীরা নাম বদলান। সমালোচকরা এটিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের প্রতিচ্ছবি বলে মনে করেন।

অনেক নারী কর্মক্ষেত্রে জন্মের নাম ব্যবহার করেন, কিন্তু সরকারি নথিতে বিয়ের পরের পদবি। সরকার পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্সে উভয় নামের অনুমতি দিলেও জাপানই একমাত্র দেশ যেখানে স্বামী–স্ত্রীকে আইনত একই পদবি বাধ্যতামূলক। জাতিসংঘের নারী বৈষম্য দূরীকরণ কমিটি জাপান সরকারকে আইন সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে।

বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো পরিবর্তন চায়, কারণ আইনি নামের অমিল আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করে। কেইদানরেন অনেক নারীর বক্তব্য সংগ্রহ করেছে যাদের ক্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষাবিদরা বিয়ের আগের নামে গবেষণা প্রকাশ করেন কিন্তু পরে স্বীকৃতি পান না। কেইদানরেনের জরিপে ৮২ শতাংশ নারী নির্বাহী আলাদা পদবির অধিকার সমর্থন করেন।

‘আসুনিওয়া’ প্রতিষ্ঠানের ক্রিয়েটিভ প্ল্যানার ইউকা মারুয়ামা বলেন, ‘জাপানে একটি ক্রমবর্ধমান সমস্যাকে তুলে ধরতেই আমরা এই প্রজেক্ট শুরু করেছি। পদবি বদলাতে হবে, শুধু এই ভয়েই অনেক মানুষ এখন বিয়ে করতে দ্বিধা করছেন।’ ইউকা মারুয়ামা আরও বলেন, ‘আমরা খুব সাধারণ ও কিছুটা মজার একটি ধারণা মানুষের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। যাঁরা আগে থেকেই একই পদবি ব্যবহার করছেন, তাঁদের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। এর মাধ্যমে আমরা মূল সমস্যাটিকে মানুষের কাছে আরও দৃশ্যমান ও সহজবোধ্য করতে চেয়েছি।’

কিন্তু লিবারেল ডেমোক্রেটিক সরকার আইন পরিবর্তন প্রত্যাখ্যান করছে। রক্ষণশীল নেতারা বলছেন, এতে ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস হবে এবং শিশুদের বিভ্রান্তি হবে। প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি আগ্রহ দেখাননি, বরং জন্মের নামের স্বীকৃতি বাড়ানোর বিল সমর্থন করছেন।

তাকাইচি প্রথম বিয়েতে স্বামী ইয়ামামোতোর পদবি নিয়েছিলেন। ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের পর ২০২১ সালে স্বামী তাকাইচি পদবি গ্রহণ করেন। তিনি বলেছেন, ‘পারিবারিক নিবন্ধনে স্বামী–স্ত্রী ও তাঁদের সন্তানদের একই পদবি থাকাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

আয়োজকরা গোপনীয়তার কারণে যুগলদের খোঁজ নেন না, তবে অনেকে খুশি ছিলেন। ৩৩ বছরের চাকরিজীবী তাইশো সুজুকি বলেন, ‘আমি এর আগেও ম্যাচমেকিং পার্টিতে গিয়েছি। কিন্তু আমার মনে হয়েছিল, এই আয়োজন বেশ অন্য রকম হবে। আরেকজন সুজুকিকে বিয়ে করার বিষয়ে আগে কখনো ভাবিনি। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, এটি সত্যিই একটি নিরাপদ বিকল্প। বিয়ের পর আমার নিজের পদবি ছাড়তে চাই না। জানি, অনেক নারীও তাঁদের নামের ক্ষেত্রে ঠিক এমনটাই অনুভব করেন।’

একটি ডেটিং অ্যাপে ২০ ও ৩০–এর কোঠায় আড়াই হাজারের জরিপে ৩৬.৬ শতাংশ নারী ও ৪৬.৬ শতাংশ পুরুষ পদবি বদলতে অনাগ্রহী। ৭ শতাংশের বেশি বলেছেন, পদবি বদলাতে না রাজি হলে সম্পর্ক ভাঙবেন। তাইশো ও সঙ্গিনী সুজুকি পদবিকে আড্ডার বিষয় বানিয়েছিলেন। তাইশো বলেন, ‘এখন আমি ৩০–এর কোঠায়। আমার জীবনের অগ্রাধিকারগুলো বদলে গেছে। আমি এখন বিয়ে করে সন্তান নিতে চাই। যদি এমন কোনো নারীর দেখা পাই, যাঁর পদবিটা বেশ অদ্ভুত বা আনকমন, তবে বুঝব কেন তিনি তাঁর নামটা ধরে রাখতে চাইছেন। আমার মনে হয়, সে ক্ষেত্রে আমাদের দুজনকেই বসে কথা বলে কোনো একটা সমাধান বের করতে হবে।’

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান