সিল্কের সাদা-কালো নকশিকাঁথা শাড়ি পরে হাজির হয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে সব ক্যামেরা ঘুরে গেল তাঁর দিকে। সামনে ডেকে নেওয়ার সময় মুক্তকণ্ঠর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন পরিচয় করিয়ে দিলেন ‘নকশার তরুণতম মডেল’ বলে। কদিন আগেই তাঁকে নিয়ে প্রচ্ছদকাহিনি ছাপা হয়েছে। শিরোনাম ছিল, ‘৮৪ বছরেও যেভাবে ফিট দিলারা জামান’।

অভিনেত্রী দিলারা জামানের মতো সাম্প্রতিক সময়ে যাঁরা নকশার প্রচ্ছদে স্থান পেয়েছেন, তাঁদের কয়েকজনকে নিয়ে গতকাল মঙ্গলবার দারুণ এক আড্ডা জমেছিল। এসেছিলেন জয়া আহসান, আজমেরী হক বাঁধন, জান্নাতুল পিয়া, মাসুমা রহমান নাবিলা, তাসনিয়া ফারিণ, শবনম ফারিয়া, মুমতাহিনা টয়াসহ অনেকে।

ভেন্যু ছিল প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হল, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা বিশেষ ছিল না। ঝলমলে আলো বা কনফেত্তিরও অভাব ছিল। চায়ের সঙ্গে টা খেতে খেতেই সবাই গল্প করেছেন, শুনিয়েছেন নকশা নিয়ে তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা।

প্রায় ২৭ বছর ধরে মুক্তকণ্ঠর সঙ্গে প্রতি মঙ্গলবার প্রকাশিত হচ্ছে লাইফস্টাইলবিষয়ক ক্রোড়পত্র ‘নকশা’। মুক্তকণ্ঠর পাঠক যাঁরা, তাঁদের কাছে মঙ্গলবার মানেই ‘নকশাবার’। আর নকশা মানেই সমসাময়িক ফ্যাশন, খাবার, অন্দরসজ্জা, রূপসজ্জা আর সবচেয়ে বড় কথা—দেশীয় পোশাকের খবরাখবর।

আড্ডার শুরুতেই সঞ্চালক সুমনা শারমীন সবাইকে মনে করিয়ে দিলেন, গত ২৭ বছরে নকশা সব সময় শুধু দেশীয় পোশাক ও দেশীয় ডিজাইনারদের জয়গান গেয়ে গেছে। এই যাত্রায় সহায়তা করেছেন বহু মডেল, অভিনেত্রী, ডিজাইনার ও রূপবিশেষজ্ঞ। কাজের সম্পর্ক ছাপিয়ে অনেকেই হয়ে গেছেন নকশার আপনজন।

রূপবিশেষজ্ঞ কানিজ আলমাস খান যেমন বলছিলেন, ‘আমরা মনে করি আমরা নকশার “হোস্ট”, অতিথি নই। শুরু থেকেই নকশার সঙ্গে আছি, মুক্তকণ্ঠর সঙ্গে আছি। নকশার প্রতি ভালোবাসা তো আছেই। কারণ, নকশার মাধ্যমেই অনেক মানুষকে সাজানোর, অনেক রকমভাবে কাজ করার সুযোগ আমি পেয়েছি।’

অভিনেত্রী জয়া আহসান নকশার মডেল হয়েছেন একাধিকবার। বেশ অধিকার নিয়েই বললেন, ‘নকশাকে চোখের সামনেই বেড়ে উঠতে দেখেছি; কিংবা বলা যায় আমি আর নকশা একসঙ্গে বড় হয়েছি।’ এ কথা অবশ্য শুধু জয়া নয়, আরও অনেকের ক্ষেত্রেই সত্য। কোরিওগ্রাফার আজরা মাহমুদ বলছিলেন, ‘আমরা যখন শুরু করেছি, নকশা তখনো জনপ্রিয় ছিল, এখনো জনপ্রিয়। নকশায় অনেকবার কাজ করার সুযোগ হয়েছে। এখন আরও ভালো লাগে, যখন দেখি আমার স্টুডেন্টরা নকশার মডেল হচ্ছে।’

প্রবেশপথেই আমন্ত্রিতদের হাতে তুলে দেওয়া হয় বেলি ফুলের মালা। তবে নকশা পরিবারের এই সদস্যদের জন্য চমক অপেক্ষা করছিল আরও। অভিনেত্রী বাঁধন যখন বলছিলেন, ‘…আমি যখন প্রথম নকশায় ডাক পেলাম, মনে আছে তার কদিন পরই আমার পরীক্ষা ছিল। চেহারার অবস্থা খুবই খারাপ। তারপরও না করিনি। রিকশায় বসে একটা ছবি তুলেছিলাম। পরনে সাদা শার্ট। ওই ছবিটার কথা এখনো আমাকে অনেকে বলে। খুব পছন্দের একটা ছবি…’ কথা শেষের আগেই বাঁধনের হাতে তুলে দেওয়া হয় কাগজে মোড়ানো একটা উপহার। কাগজ সরিয়ে বাঁধন দেখেন, সেই ছবিই বাঁধাই করা! বনলতা এক্সপ্রেস অভিনেত্রী দেখে এতই চমকে গেলেন, তাঁর চোখে-মুখে বিস্ময়ের রেশ রয়ে গেল বেশ ‘কিছুক্ষণ’। এমন বাঁধাই করা চমক ছিল অতিথিদের সবার জন্য।

প্রথমবার নকশায় ডাক পাওয়াটা বাঁধনের মতো অনেকের জীবনেই আজও বিশেষ কিছু। স্মৃতিচারণা করলেন কয়েকজন। মডেল ও অভিনেত্রী প্রিয়ন্তি উর্বি বলছিলেন, ‘আমার মা বলত, “নকশায় কিছু ছবি পাঠাও, তাহলে ডাক আসবে।” আমি বলতাম, ছবি পাঠাতে হবে না, ভালো কাজ করলে এমনিই আমাকে খুঁজে নেবে। সত্যি সত্যি…প্রথম ফোনটা আম্মুর সামনেই এসেছিল। আম্মু খুশিতে বিরিয়ানি রাঁধা শুরু করেছিল। এটা আমার কাছে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতো।’ মডেল ও অভিনেত্রী দোয়েল বলেন, ‘নকশায় কাজ করার আগে আমার কোনো ধরনের বড় ক্যামেরা বা লাইটের সামনে ছবি তোলার অভিজ্ঞতাই ছিল না। নকশার কাভারের জন্য প্রথম কোনো ডিএসএলআর ক্যামেরায় ছবি তুলি। সেখান থেকেই শুরু আমার পথচলা।’ পরে নকশার ফটোশুটের সুবাদেই চলচ্চিত্রে অভিনয়েরও ডাক পান দোয়েল।

অভিনেত্রী শবনম ফারিয়ার প্রথমবারের অভিজ্ঞতাটাও বেশ মজার। তাঁর ভাষ্য, ‘যখন প্রথম মডেলিং শুরু করি, বাসায় জানাইনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের পাশাপাশি লুকিয়ে দু-একটা শুট করতাম। প্রথম ধরা খেয়েছিলাম; কারণ, নকশায় আমার ছবি ছাপা হয়েছিল। আম্মা সকালবেলা পত্রিকা খুলে দেখে আমার ছবি! ফোন করে বলেছিল, “আজকে বাসায় আসো…।” নকশা বলে রক্ষা। পরে মায়ের সঙ্গেও নকশায় আমার ছবি ছাপা হয়েছে। নকশা এভাবেই আমাদের পরিবারের একটা অংশ হয়ে গেছে।’

মডেল জান্নাতুল পিয়া, অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলাও বলছিলেন, নকশা তাঁদের কাছে পরিবারের মতো। নাবিলা বলেন, ‘আমার বর, আমার কন্যাসন্তান, আমার মা—সবাইকে নিয়েই কোনো না কোনো সময় নকশায় ফটোশুট করা হয়েছে। আমার মনে হয় নকশা আমাদের প্রত্যেকের পরিবারকে উদ্‌যাপন করে।’ মডেল ফয়সাল নীল বলেন, ‘যেদিন নকশায় আমার ছবি আসে, আম্মু সকালবেলা উঠেই তিন কপি পত্রিকা কেনে। এক কপি রাস্তায়ই কাউকে না কাউকে দিয়ে দেয়। বলে, “দেখেন, আমার ছেলের ছবি আসছে।” এক কপি আমার বাবার জন্য রাখে, আমার বাবা ঢাকার বাইরে থাকে। বাকি এক কপি আমার হাতে আসে।’

আড্ডার শেষ অংশে সবাইকে ধন্যবাদ জানান মুক্তকণ্ঠ সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রতি সপ্তাহের মঙ্গলবার, যেদিন নকশা প্রকাশিত হয়, সেদিন মুক্তকণ্ঠর মুদ্রণসংখ্যা সবচেয়ে বেশি থাকে। আপনারাই নকশার শক্তি। আপনাদের সবাইকে শুভেচ্ছা।’