মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাত্রির মধ্যরাতে বগুড়ার মম ইন-এর সবুজ চত্বরে শত শত দর্শকের উপস্থিতি ছিল। ক্লান্তির কোনো চিহ্ন ছাড়াই তারা আগ্রহ নিয়ে মঞ্চের আয়োজন দেখছিলেন। ঠিক তখনই মঞ্চে উঠলেন রুনা লায়লা। তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠল ‘সাধের লাউ বানাইলাম বৈরাগী’। দর্শকেরাও সুরে সুর মিলিয়ে গাইতে শুরু করলেন।
হঠাৎ গানের তালে মঞ্চে প্রবেশ করলেন আরেক অগ্রজ শিল্পী খুরশীদ আলম, ‘চুমকি চলেছে একা’ গানের কণ্ঠশিল্পী। তিনি গানের লয় মিলিয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে শুরু করলেন। মুহূর্তেই তুমুল করতালির হুল্লোড়। উপস্থিত অনেকের মতে, এটাই ছিল ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’-এর সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। অনুষ্ঠানে যেমন ছিল বিচিত্র আয়োজন, তেমনি ছিল নানা চমকও।
মঞ্চে একেবারে শেষের দিকে ওঠা রুনা লায়লা প্রথমেই গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা ও শফিক তুহিনের সুর করা একটি দেশাত্মবোধক গান শোনালেন। এরপর খালি কণ্ঠে গাইলেন সাম্প্রতিক ঈদের সিনেমার আলোচিত গান ‘জ্বালা জ্বালা’। তাঁর সঙ্গে মঞ্চে যোগ দিলেন ইমরান মাহমুদুল ও কোনাল। কথার ফাঁকে রুনা লায়লা ‘সাধের লাউ’ গাওয়ার শুরুর দিনের স্মৃতি শোনালেন—কলকাতা বিমানবন্দরের সেই প্রশ্ন, ‘আপনি কি সেই সাধের লাউ?’—যা শুনে দর্শকেরা আবেগাপ্লুত হয়ে ওঠেন।
এর আগে মঞ্চ জয় করেন সাবিনা ইয়াসমীন। ‘এই মন তোমাকে দিলাম’ দিয়ে শুরু করে ভাওয়াইয়া ও ‘মুই না শুনন তোর কথা’—দুটি গানেই তিনি দর্শকদের নস্টালজিয়ায় ভাসিয়ে দেন।
পাঁচ ঘণ্টা দীর্ঘ এই ঝলমলে আয়োজনে বিভিন্ন সময়ে মঞ্চে গান পরিবেশন করেন খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, অণিমা রায় থেকে শুরু করে সমকালীন শিল্পী কোনাল, ইমরান মাহমুদুল, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা, লুইপা, মাহতিম শাকিব, এঞ্জেল নূরসহ অনেকে। নাচ ও বিশেষ পরিবেশনা বাড়তি আকর্ষণ যোগ করল। রাত ১১টার পর বগুড়ার সন্তান অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের অংশগ্রহণে বেহুলা–লখিন্দরের গল্পভিত্তিক নৃত্যনাট্য দর্শকদের আলাদা আনন্দ দেয়।
২০০৪ সালে শুরু হওয়া এই আয়োজন দুই দশক পেরিয়ে উত্তরবঙ্গে আরও বড় আকারে ফিরে এসেছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বগুড়ার মম ইন-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠান। সমবেত কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্প ভরা’ ও ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’—এই দুটি গান দিয়ে শুরু হয় আসর।
উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য দেন চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং টিএমএসএসের প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগম। এ সময় সংগীতশিল্পীদের অবদানের প্রশংসা করে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আয়োজকেরা। আরও উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আইয়ের পরিচালক ও বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজ, টিএমএসএসের উপদেষ্টা মওদুদ হোসেন, অন্য প্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সানাউল আরেফিন, ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান স্বাধীনতা পদকপ্রাপ্ত মুকিত মজুমদার, আনন্দআলো সম্পাদক লেখক রেজানূর রহমান প্রমুখ।
এ আয়োজন ঘিরে বগুড়া শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। সকাল থেকেই রঙিন ব্যানার–ফেস্টুন, তারকাদের আনাগোনা ও দর্শকের ভিড়ে চারপাশ মুখরিত। বিকেল গড়াতেই ভেন্যুতে ভিড় বাড়তে থাকে, সন্ধ্যা নামতেই আলোঝলমলে মঞ্চে জমকালো আয়োজন শুরু হয়।
পুরস্কারের পূর্ণ তালিকা
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল সম্মাননা প্রদান। শিল্পী কনকচাঁপাকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়। বিশেষ সম্মাননা পান লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া। এবারের আসরে মোট ১৮টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার দেওয়া হয়। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী হয়েছেন লিজা (‘খুব প্রিয় আমার’), ইউটিউবভিত্তিক আধুনিক গানে (১ লাখ ভিউ ও ১৫০০ লাইক) স্বীকৃতি পান এঞ্জেল নূর (‘যদি আবার’)। আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার বাপ্পা মজুমদার (‘অবশেষে’), আর গীতিকার হিসেবে সম্মাননা পান তারেক আনন্দ (‘প্রেমবতী’) ও শাহনাজ কাজী (‘মা’)।
ব্যান্ড বিভাগে শ্রেষ্ঠ হয়েছে মেট্রিক্যাল (‘গণতন্ত্রের ঘুড়ি’), একই গানের জন্য শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সেতু চৌধুরী।
দ্বৈত সংগীতে শ্রেষ্ঠ হয়েছেন ইমরান মাহমুদুল ও সিঁথি সাহা (‘প্রেম বুঝি’)। লোকসংগীতে শ্রেষ্ঠ শিল্পী বিউটি (‘চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক’), ইউটিউবভিত্তিক বিভাগে লটারি বিজয়ী শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (‘মা লো মা’)।
চলচ্চিত্রের গানে শ্রেষ্ঠ কণ্ঠশিল্পী আতিয়া আনিসা (‘ছোট্ট সোনা’), ইউটিউব বিভাগে স্বীকৃতি পান দিলশাদ নাহার কনা (‘দুষ্টু কোকিল’)। সুরকার হিসেবে পুরস্কৃত শওকত আলী ইমন, গীতিকার রোহিত সাধুখাঁ (‘বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা’)।
মিউজিক ভিডিও নির্মাতা হিসেবে সম্মাননা পান তানভীর তারেক (‘পাখি আমার নীড়ের পাখি’)। নজরুলসংগীতে শ্রেষ্ঠ শহিদ কবির পলাশ এবং উচ্চাঙ্গসংগীতে শ্রেষ্ঠ নাশিদ কামাল।
শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী হয়েছেন সভ্যতা (‘অধিকার’) এবং শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে বেঙ্গল মিউজিক।
সব মিলিয়ে দুই দশকের ঐতিহ্যবাহী এই আয়োজন হয়ে উঠেছে বর্ণাঢ্য, তারকাখচিত ও স্মরণীয় সংগীত উৎসব। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের মিলনমেলা, দর্শকের উচ্ছ্বাস এবং মঞ্চের চমক—সবকিছু মিলিয়ে ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫’ সফল হয়েছে।
আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম বলেন, ‘এই আয়োজনকে আমরা শুধু পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসবে রূপ দিতে চেয়েছি। ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন সম্ভব—বগুড়ায় এই আয়োজনের মাধ্যমে সেটিই দেখাতে চেয়েছি। মানুষের প্রতিক্রিয়া উচ্ছ্বাস দেখে মনে হয়েছে সেটা আমরা পেরেছি। টিএমএসএস কতৃপক্ষকে আমরা ধন্যবাদ দিতে চাই।’ অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন নীল হুরেজাহান ও অপু মাহফুজ।






