চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী মোহাম্মদ জোবায়ের (৩১) স্বল্প আয়ের চাকরি আর চায়ের দোকানের উপার্জন নিয়েই সংসার চালান। তবু অনটন কমে না, তাই কষ্ট ভুলতে তিনি গান গেয়ে যান।

মাত্র চার বছর বয়স থেকেই গান গাওয়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা করার সুযোগ পাননি। বাবা মো. ইয়াসিন ছিলেন চায়ের দোকানি। স্বল্প আয়ের সংসারে কোনোরকমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা হয়েছে তাঁর।

রাত ১১টা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ১ নম্বর গেটের রেল ক্রসিং এলাকায় ছোট্ট চায়ের দোকানে নিরাপত্তা প্রহরীর পোশাকে এক যুবক চা বানিয়ে গ্রাহকদের হাতে তুলে দিচ্ছেন। সুরেলা গলায় গান গাইছেন তিনিই—দোকানের মালিক মোহাম্মদ জোবায়ের। রাহাত ফতেহ আলী খান, নুসরাত ফতেহ আলী খান, সুবীর নন্দী ও সঞ্জীব চৌধুরীর গান তিনি টানা গেয়ে যান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেল ক্রসিং এলাকার মো. ইয়াসিনের ছেলে।

বৃদ্ধ বাবা, অসুস্থ মা, স্ত্রী ও এক বছর বয়সী শিশু নিয়ে জোবায়েরের সংসার। চায়ের দোকান আর স্বল্প বেতনের প্রহরীর চাকরিতে সবসময়ই অনটন লেগে থাকে। বারবার হতাশ হন তিনি। সেই হতাশা ভুলতেই গান করেন।

গত শনিবার রাতে দোকানে গিয়ে কথা হয় জোবায়েরের সঙ্গে। চা বিক্রির ফাঁকে তিনি জানান, মাত্র চার বছর বয়স থেকেই গান গাওয়ার প্রতি আগ্রহ ছিল তাঁর। তবে প্রাতিষ্ঠানিক কোনো চর্চা তিনি করতে পারেননি। তাঁর বাবাও ছিলেন চায়ের দোকানি। স্বল্প আয়ের এ সংসারে কোনো রকমে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছেন তিনি। এরপর সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়। চাকরি না পেয়ে ২০১৬ সালে নিজেই চায়ের দোকান খোলেন। সেই থেকে এভাবেই চলছে।

চায়ের দোকানে কাজ করতে করতেই ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরী (অস্থায়ী) পদে চাকরি নেন জোবায়ের। চাকরির এক মাস পর বিয়ে করেন। এর মধ্যে মায়ের প্যারালাইসিস হয়। পরিবারের খরচ বেড়ে যায়। তাই দিনের বেলায় প্রহরীর কাজ শেষ করে রাতে চায়ের দোকানে বসেন।

জোবায়ের বলেন, প্রায় দুই বছর ধরে এই দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু চাকরির কারণে দোকান আর আগের মতো চালানো সম্ভব হয় না। আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে গান গাইতেন দোকানে। তাঁদের উৎসাহই ছিল ভরসা।

নিজের কষ্টের কথা জানিয়ে জোবায়ের বলেন, ‘বর্তমানে সংসারের চাপ আরও বেড়েছে। অসুস্থ মা, ছোট সন্তান—সব মিলিয়ে দিন পার করা কঠিন হয়ে উঠেছে। বাইরে থেকে তাঁকে স্বাভাবিক মনে হলেও ভেতরের সংগ্রামটা কেউ দেখে না। একদিন কাজ করতে না পারলে সেই দিনের আয়ের সুযোগও হারাতে হয়। তাই একসময় শখের বশে গান গাইলেও এখন কষ্ট ভুলতে গান গাই।’

জোবায়ের সারা জীবন গান চালিয়ে যেতে চান। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা প্রহরীর চাকরিটা স্থায়ী হলে সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরবে। তখন গান নিয়ে আলাদা করে ভাববেন। একদিন ভরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে গান গাইবেন। এমন সুযোগ পেলে নিজেকে প্রমাণ করে দেবেন।