ক্ষুদ্রঋণ নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) প্রায় সাড়ে ৯০০ ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান (এমএফআই) বা এনজিওকে ছুটির দিনে কর্মীদের কাজ করানো বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে। সম্প্রতি দেশের ৯৪৯টি এনজিওকে এই নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
এমআরএ জানায়, সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার ও শনিবার হওয়া সত্ত্বেও অনেক ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা তা পুরোপুরি ভোগ করতে পারছেন না। কারণ এমএফআইগুলো অফিস ছুটির পরে এবং শনিবারসহ অন্যান্য অফিস বন্ধের দিনও ঋণের কিস্তি আদায়ের কাজে কর্মীদের নিয়োগ দিচ্ছে। তাই সপ্তাহের রোববার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯টা-৫টা অফিসের সময়সূচি মেনে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অফিস সময়সূচি মনে করিয়ে এই নির্দেশনা জারি করেছে এমআরএ।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক জ্বালানিসংকটের প্রেক্ষাপটে সরকারি-বেসরকারি অফিসের সময়সূচিতে পরিবর্তন এনেছে সরকার। সে হিসাবে গত রোববার থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এমএফআইগুলোর অফিস সকাল ৯টা–৪টা পর্যন্ত চলবে বলে আরেক নির্দেশনা দিয়েছে এমআরএ।
এমআরএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে সনদপ্রাপ্ত এমএফআই রয়েছে ৬৭০টি এবং সাময়িক অনুমোদনপ্রাপ্ত ২৭৯টি। এসব প্রতিষ্ঠানের মোট জনবল ২ লাখ ২৯ হাজার। এ তথ্য গত ৩১ মার্চ পর্যন্ত। এমআরএর নজরে এসেছে, অফিস খোলা রাখার নির্ধারিত সময় মানছে না অনেক এমএফআই।
এমআরএর এক্সিকিউটিভ ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নতুন কোনো নির্দেশনা দিইনি। একই ধরনের নির্দেশনা আগেও ছিল, কিন্তু কেউ কেউ মানলেও বেশির ভাগ এমএফআই তা মানছে না। আমরা জানি যে কর্মকর্তা-কর্মচারী সবারই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন রয়েছে। তাঁদের স্বার্থে আগের নির্দেশনা শুধু মনে করিয়ে দিলাম।’
এমআরএ বলেছে, ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের অফিস সময়সূচি ও শনিবার অফিস বন্ধ রাখার বিষয়ে কয়েক বছরে একাধিক নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি লক্ষ করা যাচ্ছে, কোনো কোনো ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ছুটির পরে এবং শনিবারসহ অন্যান্য ছুটির দিন ঋণ আদায়ের কাজসহ অন্যান্য কাজে নিয়োজিত রাখা হয়, যা এমআরএর আগের নির্দেশনার পরিপন্থী।
এমআরএ সূত্রে জানা গেছে, আপাতত সাপ্তাহিক ছুটি দুই দিনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় সংস্থাটি। পরিদর্শনে গেলে কর্মীদের পক্ষ থেকে এমএফআইগুলোর অমানবিক চিত্র তুলে ধরা হয়। তবে ব্র্যাকসহ কিছু বড় এমএফআই ছুটির দিন ও দৈনিক কর্মঘণ্টা অনুসরণ করছে।
জবাবে সিডিএফ যা বলল
এমআরএর নির্দেশনার চিঠি পাওয়ার পর ৫ এপ্রিল জবাব দেয় এমএফআইগুলোর সংগঠন ক্রেডিট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফোরাম (সিডিএফ)। সিডিএফ বলেছে, হাওর, চর ও সমুদ্র উপকূলবর্তী নিম্ন আয়ের ভিন্ন ভিন্ন পেশার গ্রাহকেরা দিনের ভিন্ন ভিন্ন সময় লেনদেন করে থাকে। মৎস্যজীবীদের সুবিধার্থে ভোরবেলায় লেনদেন করতে হয়। গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলের গ্রাহকেরা সারা দিনের কাজ শেষে বিকেল বা সন্ধ্যার পর কিস্তি পরিশোধ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এ দীর্ঘকালীন অনুশীলনের কারণে ৯-৫টা ধরাবাঁধা নিয়ম এ খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সিডিএফ আরও বলেছে, মাঠকর্মীদের প্রায়ই দিনে দুই–তিনবার গ্রাহকদের কাছে যেতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকদের অনুরোধে সন্ধ্যার পর কিস্তি আদায় করতে হয়। ৫টার পর কাজ বন্ধ করে দিলে এই প্রশংসিত ঋণ আদায়ের সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। সিডিএফ আরও বলেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যেখানে রাত ৮-১০টা পর্যন্ত কাজ করে, সেখানে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৫টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। তবে নারী কর্মীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে সন্ধ্যার পর তাঁদের মাঠে না থাকাই শ্রেয়।
শুক্র ও শনিবার বন্ধের অনুশীলনটি ধীরে ধীরে গড়ে তোলার পক্ষে সিডিএফ। ফোরামটি চিঠিতে বলেছে, প্রাথমিকভাবে ছয় মাস দুটি শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ রাখা যেতে পারে। পরবর্তী পর্যায়ে মাসিক সমাপনী কাজের গুরুত্ব ও বকেয়া আদায়ের জন্য দুটি শনিবার খোলা রাখার বিষয়ে বিবেচনা করা যেতে পারে। এমএফআইগুলোর নিজেদের সুবিধা অনুযায়ী অফিস ও মাঠপর্যায়ের দৈনিক কর্মকাল ঠিক করার অনুমতি চেয়ে চিঠিতে সিডিএফ বলেছে, মাঠকর্মী ও শাখা ব্যবস্থাপকদের বিনা ভাড়ায় আবাসনের ব্যবস্থা করে থাকে এমএফআইগুলো এবং নিজেদের পারফরম্যান্স ধরে রাখার জন্য ছুটি না দিয়ে নিজ উদ্যোগেই তারা কাজ করে থাকে। এতে প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমে এবং ঋণ আদায় বাড়ে।
সিডিএফের চেয়ারম্যান মুর্শেদ আলম সরকার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনানুষ্ঠানিক খাতের লোকদের নিয়ে কাজ করি। আনুষ্ঠানিক খাতের মতো আমাদের ওপর নিয়মকানুন বর্তালে ঝামেলা বাধার আশঙ্কা আছে। আনুষ্ঠানিক খাতের মধ্যে ব্যাংকের কর্মীদেরও অনেক সময় ৮টা পর্যন্ত অফিস করতে হয়।’






