মাস্টার শেফ কিশোর চৌধুরীর কৃপায় বিশ্বব্যাপী এখন পান্তাভাতের স্বাদ জানা হয়েছে। গরমকালে আবহমান বাংলার এই খাদ্য-ঐতিহ্যের জনপ্রিয়তা বাড়ে। এটি শুধু স্বাদে অনন্যই নয়, পুষ্টিগুণেও সমৃদ্ধ।
লাল চালের পান্তার পুষ্টিগুণ সাদা চালের চেয়ে বেশি। ভারতের আসাম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, আগের দিন রাতে পানিতে ভিজিয়ে রাখা ভাত বিভিন্ন অণুপুষ্টি (মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট সাপ্লিমেন্ট) গুণে সমৃদ্ধ হয়।
সাধারণত ভাত ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা পানিতে রাখলে বাতাসের (অক্সিজেন) সংস্পর্শে আসতে পারে না, ফলে ভাতে গাজনপ্রক্রিয়া (ফারমেন্টেশন) শুরু হয়।
এতে ভাতের কার্বোহাইড্রেট ভেঙে ফাইটেটের মতো অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টরগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং ভাত হাইড্রেট হতে থাকে।
এর ফলে সাধারণ ভাতের তুলনায় পান্তাভাতে আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, জিংক, ফসফরাস, ভিটামিন বি প্রচুর পরিমাণে বৃদ্ধি পায়।
গবেষণার তথ্য অনুসারে, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে আয়রন থাকে ৩ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। কিন্তু ১২ ঘণ্টা ভিজিয়ে রাখা পান্তাভাতে এটি ৭৩ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম হয়। একইভাবে ক্যালসিয়ামের পরিমাণও অনেক বাড়ে।
১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ ভাতে ক্যালসিয়াম থাকে ২১ মিলিগ্রাম, পান্তাভাতে ৭৮৫ মিলিগ্রাম। পান্তাভাতে পটাশিয়াম ৭৯৯ মিলিগ্রাম, যা সাদা ভাতে ৭৭ মিলিগ্রাম।
এছাড়া ম্যাগনেশিয়াম ও জিংকের উপস্থিতিও বেড়ে যায়। পান্তায় ৬৮ দশমিক ৭ মিলিগ্রাম আয়রন আছে, যা সাদা ভাতে ২ দশমিক ৯ মিলিগ্রাম। তাই রক্তশূন্যতা কমাতে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
গবেষকেরা বলেন, ভাতের ফাইটেটের মতো অ্যান্টি-নিউট্রিশনাল ফ্যাক্টর আয়রন, ক্যালসিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও জিংকের মতো পুষ্টিকর পদার্থকে আটকে রাখে। ফলে ভাত খেলেও শরীর এগুলো গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু ফারমেন্টেশনের কারণে পান্তাভাতের ফাইটেট দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পুষ্টিকর পদার্থগুলো উন্মুক্ত হয়, যা শরীর গ্রহণ করতে পারে।
এছাড়া গাজনপ্রক্রিয়ায় পান্তাভাতে ভালো ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়, যা অন্ত্রের স্বাস্থ্য উন্নত করে, হজমশক্তি বাড়ায়। এতে থাকা ফ্ল্যাভোনয়েড ও মেটাবলাইটস শরীরকে প্রদাহ থেকে রক্ষা করে এবং ক্যানসার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
পান্তাভাতের বিটা-সিটোস্টেরল ও কেম্পেস্টেরোল কোলেস্টেরল কমায়। এটি শরীরকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী ফুড অ্যান্ড হিউম্যানিটিতে পান্তাভাত নিয়ে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।
সেই গবেষণায় পান্তায় অনেক নতুন অণুজীব পাওয়া গেছে বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। পান্তায় প্রোবায়োটিক-সমৃদ্ধ ব্যাকটেরিয়া পাওয়া গেছে, যা রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে পারে।
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, পান্তা খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হারে বাড়ে।
১২ ঘণ্টার বেশি ফারমেন্টেড হলে পান্তাভাতে অ্যালকোহল তৈরি হতে পারে, যা খেলে পেটের পীড়া বা ডায়রিয়া হতে পারে।
ডায়াবেটিস রোগী ও অতিরিক্ত ওজনের মানুষদের নিয়মিত পান্তা খাওয়া উচিত নয়।
পান্তা তৈরিতে অপরিষ্কার পাত্র বা দূষিত পানি ব্যবহার করলে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া তৈরি হতে পারে।






