বগুড়া শহরে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নেমে আসে এক অন্যরকম উৎসবের আমেজ। ‘মমো ইন’-এর উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে ২০তম ‘টিএমএসএস চ্যানেল আই মিউজিক অ্যাওয়ার্ডস’ অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দেশের সংগীতজগতের বিভিন্ন প্রজন্মের তারকারা এক মঞ্চে সমবেত হন। খুরশীদ আলম, রফিকুল আলম, রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিনের মতো প্রবীণদের পাশাপাশি মাহতিম শাকিব, এঞ্জেল নূরের উপস্থিতিতে আয়োজন হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত উৎসবে।

২০০৪ সালে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠান দুই দশক পেরিয়ে উত্তরবঙ্গে এবার আরও বড় আকারে হাজির হয়। ঢাকার বাইরে এমন বৃহৎ সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়ে স্থানীয়দের আগ্রহ ছিল অসাধারণ। সকাল থেকেই শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের উত্তেজনা—ব্যান্ড পার্টির বাজনা, রঙিন ব্যানার-ফেস্টুন এবং তারকাদের আনাগোনায় চারপাশ মুখরিত হয়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় ভেন্যুতে ভিড় বেড়ে যায় এবং আলোকিত মঞ্চে শুরু হয় জমকালো অনুষ্ঠান।

সন্ধ্যা সাতটার দিকে সংগীতের মধ্য দিয়ে পর্দা ওঠে অনুষ্ঠানের। প্রবীণ ও নবীন শিল্পীদের কণ্ঠে ‘ধনধান্য পুষ্পে ভরা’ ও ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ গান শোনা যায়, যা আবেগঘন পরিবেশ তৈরি করে। এরপর মঞ্চে উঠে বক্তব্য দেন তথ্যমন্ত্রী জহিরউদ্দীন স্বপন, ফরিদুর রেজা সাগর এবং হোসনে আরা বেগম। টিএমএসএস-এর প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক হোসনে আরা বেগমসহ বক্তারা আয়োজনের ধারাবাহিকতা ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরেন। এছাড়া উপস্থিত ছিলেন টিএমএসএস-এর উপদেষ্টা ডাক্তার মওদুদ হোসেন, অন্য প্রকাশের মাজহারুল ইসলাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সানাউল আরেফিন, ইমপ্রেস গ্রুপের পরিচালক জহির উদ্দিন মাহমুদ, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান স্বাধীনতা পদক প্রাপ্ত মুকিত মজুমদার প্রমুখ।

আজীবন সম্মাননার জন্য জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী কনকচাঁপার নাম ঘোষণা করেন আফসানা মিমি। তুমুল করতালির মধ্যে কনকচাঁপাকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা স্মারক ও চেক তুলে দেন আয়োজক ও অতিথিরা। তাঁর শংসাপত্র পাঠ করেন শাইখ সিরাজ। সম্মাননা গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত কনকচাঁপা তাঁর স্বামী সুরকার ও সংগীত পরিচালক মইনুল ইসলাম খানকে মঞ্চে ডেকে বলেন, “আমার আজকের অবস্থানে আসার পেছনে সবচেয়ে বেশি অবদান তাঁর। এই সম্মান আসলে তাঁরই প্রাপ্য।” অনুষ্ঠানে ফরিদুর রেজা সাগর বলেন, “আমরা সব সময় শিল্পীদের চ্যানেল আই পরিবারের অংশ মনে করি। প্রয়াত আজম খানের “উচ্চারণ” ব্যান্ডটি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছিল, আমরা তাদের আবার ফিরিয়ে এনেছি। এই আয়োজনের মধ্য দিয়েই তারা নতুনভাবে পথচলা শুরু করবে।”

এরপর বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে পুরস্কার প্রদান করা হয়। আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান, লোকসংগীত, ব্যান্ড, সুরকার, গীতিকার থেকে শুরু করে মিউজিক ভিডিও—বিভিন্ন শাখায় শিল্পীরা স্বীকৃতি পান। পারফরম্যান্সেও ছিল বৈচিত্র্যময়। রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, খুরশীদ আলম ও রফিকুল আলমের গানের পাশাপাশি কোনাল, ইমরান মাহমুদুল, সিঁথি সাহা, ঝিলিক, লিজা ও লুইপার পরিবেশনায় মঞ্চ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নাচ ও বিশেষ পরিবেশনায় অপু বিশ্বাস ও আদর আজাদের উপস্থিতি যোগ করে অতিরিক্ত উচ্ছ্বাস।

পুরস্কারপ্রাপ্তরা
এবার আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হয়েছেন লিজা (খুব প্রিয় আমার), শ্রেষ্ঠ মিউজিক ভিডিও নির্মাতা তানভীর তারেক (পাখি আমার নীড়ের পাখি), শ্রেষ্ঠ দ্বৈত সংগীত শিল্পী ইমরান ও সিঁথি সাহা (প্রেম বুঝি), ইউটিউব থেকে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত আধুনিক গানে এঞ্জেল নূর (যদি আবার), আধুনিক গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার বাপ্পা মজুমদার (অবশেষে), আধুনিক গানের শ্রেষ্ঠ গীতিকার তারেক আনন্দ (প্রেমবতী ), এবং শাহনাজ কাজী ( মা), শ্রেষ্ঠ ব্যান্ড মেট্রিক্যাল (গণতন্ত্রের ঘুড়ি), শ্রেষ্ঠ সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার সেতু চৌধুরী (গণতন্ত্রের ঘুড়ি), শ্রেষ্ঠ লোকসংগীত শিল্পী বিউটি ( চার চাঁদে দিচ্ছে ঝলক), ইউটিউবে ১ লক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রপ্ত লোকসংগীত লটারির মাধ্যমে বিজয়ী শরিফ উদ্দিন দেওয়ান সাগর (মা লো মা), শ্রেষ্ঠ ছায়াছবির গান আতিয়া আনিসা (ছোট্ট সোনা), ইউটিউবে কমপক্ষে একলক্ষবার ভিউ এবং ১৫০০ লাইক প্রাপ্ত ছায়াছবির গান দিলশাদ নাহার কনা (দুষ্টু কোকিল), ছায়াছবির গানে শ্রেষ্ঠ সুরকার শওকত আলী ইমন (ছোট্ট সোনা), ছায়াছবির গানে শ্রেষ্ঠ গীতিকার রোহিত সাধুখাঁ (বেঁচে যাওয়া ভালোবাসা), শ্রেষ্ঠ নজরুল সংগীত শিল্পী শহিদ কবির পলাশ (সৃজন ছন্দে), শ্রেষ্ঠ উচ্চাঙ্গসংগীত শিল্পী নাশিদ কামাল (সব সখিয়া চলো), শ্রেষ্ঠ নবাগত শিল্পী সভ্যতা (অধিকার) এবং শ্রেষ্ঠ অডিও কোম্পানি হিসেবে সম্মাননা পেয়েছে বেঙ্গল মিউজিক। বেঙ্গল মিউজিকের পক্ষে পুরস্কার গ্রহণ করেন লুভা নাহিদ চৌধুরী। এছাড়া বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন লোকসংগীতশিল্পী কাঙ্গালিনী সুফিয়া।

আয়োজনের প্রকল্প পরিচালক রাজু আলীম বলেন, “এই আয়োজনকে আমরা শুধু পুরস্কার প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিনি, এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগীত উৎসবে রূপ দিতে চেয়েছি। এখানে ৩০০ জনের বেশি শিল্পী অংশ নিয়েছেন, সব প্রজন্মের শিল্পীদের এক মঞ্চে আনার চেষ্টা করেছি।” তিনি আরও বলেন, “ঢাকার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের আয়োজন সম্ভব—বগুড়ায় এই আয়োজনের মাধ্যমে সেটিই দেখাতে চেয়েছি।” অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন নীল হুরেজাহান ও অপু মাহফুজ।