২০২৪ সালের জুলাই-পরবর্তী আর্থসামাজিক পুনর্গঠন এবং ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের এ গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সরকার দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন সরকার সাধারণ মানুষকে প্রথাগত ও নিজস্ব অর্থায়নের ওপর নির্ভরশীল ব্যয়বহুল চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আনতে চায়। তার পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক, ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার রূপরেখা প্রণয়ন করা হচ্ছে।
সম্প্রতি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) ‘জাতীয় স্বাস্থ্য অভিযোজন পরিকল্পনা (এইচএনএপি) ২০২৬-২০৩১’ প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকাঠামোর এসব যুগান্তকারী দিক উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং আইইডিসিআরের প্রণীত এই বিশদ প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য খাতের আসন্ন চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায় তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভৌগোলিক অবস্থান ও আর্থসামাজিক কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগ এবং কলেরার মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। এই বহুমাত্রিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকার এমন একটি সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে, যা জলবায়ু–সহনশীল হওয়ার পাশাপাশি কার্বন নির্গমন হ্রাস বা ‘লো কার্বন’ নীতি অনুসরণ করবে।
নতুন এই পরিকল্পনায় সর্বজনীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা বা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজ নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সেবাকে আরও দ্রুত ও বিজ্ঞানভিত্তিক করা হবে। এইচএনএপি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যকাঠামোয় রোগের প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আধুনিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা বা ‘আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম’ চালু করা হবে। এ ছাড়া চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জলবায়ু-সচেতন করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।
বিশেষ করে নারী, শিশু, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসুরক্ষায় এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের হাসপাতালগুলোকে নবায়নযোগ্য শক্তি ও প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ‘সবুজ হাসপাতাল’ বা পরিবেশবান্ধব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রূপান্তরের প্রস্তাবও রয়েছে এই প্রতিবেদনে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নের সমন্বয়ে এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি আধুনিক, টেকসই ও জনবান্ধব রূপ লাভ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।






