মিডিয়া জগতের প্রথাগত চিন্তার বিরুদ্ধে খোলাখুলি কথা বলা সহজ নয়। তবু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শেফ নাদিয়া হোসেন তাঁর ১১ বছরের পেশাগত জীবনের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে ‘গার্ডিয়ান’-এর সঙ্গে কথা বলেছেন। সেই সাক্ষাৎকার থেকে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য অংশ তুলে ধরা হলো।
এখন ওজন কমানোর জন্য আমিষকেন্দ্রিক ডায়েট, ইনজেকশন এবং চিনিকে শত্রু করা চলতি প্রচলন। এই প্রেক্ষাপটে নাদিয়ার ‘নাদিয়াস কুইক কমফরটস’ বইটি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বইটি খাবারের বর্তমান প্রবণতার উল্টোদিকের গল্প বলে। এতে রয়েছে সোনালি সিরাপ দেওয়া ডাম্পলিংসের মিষ্টি এবং তেলে ভাজা মচমচে খাবারের পুরো একটি অধ্যায়—চিজ বল থেকে শুরু করে ডিপ-ফ্রায়েড ক্যানেলোনি পর্যন্ত।
সংক্ষেপে, বইটি খাবারকে শুধু স্বাস্থ্য বা সংখ্যার হিসাব নয়, আনন্দ, স্বাদ ও আরামের বিষয় হিসেবে মনে করিয়ে দেয়। ‘আমি যদি শুধু ডিপ ফ্রাই নিয়েই একটা পুরো বই লিখতে পারতাম, নিশ্চয়ই লিখতাম!’ হাসতে হাসতে বলেন নাদিয়া হোসেন, ‘এভাবেই আমি রান্না করি, এভাবেই খাই আর এভাবেই আমার পরিবারের প্রতি ভালোবাসা দেখাই। বইয়ে যত রেসিপি আছে, সবই আমার সন্তানদের অসম্ভব পছন্দ।’
তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, সবকিছুতে ভারসাম্য দরকার। তাই বইতে ডিপ-ফ্রায়েড খাবারের পাশাপাশি রয়েছে উদ্ভিদভিত্তিক ডাল এবং টেস্টি নুডলসের মতো হালকা খাবার। নাদিয়ার ভাষায়, ‘কোনো কিছুই যখন নিজের চরম রূপে পৌঁছে যায়, তখন সেটা বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।’
‘গার্ডিয়ান’-কে খাবার ও কাজ নিয়ে নাদিয়া হোসেন অনেক তথ্য জানিয়েছেন। ভক্তদের সামনে তাঁর উত্থান ছিল ছন্দময়। ২০১৫ সালে ‘দ্য গ্রেট ব্রিটিশ বেক অফ’-এ অংশ নেওয়ার সময় তিনি ছিলেন নার্ভাস ও শান্ত স্বভাবের নারী, যা থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সেই সিজনের চ্যাম্পিয়ন।
পরবর্তী দশকে তিনি শুধু শেফ নন, প্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বও হয়ে ওঠেন। তাঁর উষ্ণতা ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি সবাইকে আকর্ষণ করে। গত ১১ বছরে রান্নার বই প্রকাশ, শিশুদের বই, টিভি শো—সব করেছেন। সামনে আরও অনেক সম্ভাবনা ছিল।
কিন্তু গত বছর গ্রীষ্মে তিনি নিজের পথ বেছে নেন। ইনস্টাগ্রামে ভিডিও পোস্ট করে জানান, বিবিসি তাঁকে নিয়ে নতুন কোনো কুকিং শো বানাবে না। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ‘রুজা: আ জার্নি থ্রু ইসলামিক কুজিন ইন্সপায়ার্ড বাই রামাদান অ্যান্ড ঈদ’ বইয়ের সঙ্গে কোনো টিভি সিরিজ যুক্ত নয়, যা তিনি ২০২৪ সাল থেকেই জানতেন। পরে ‘নাদিয়াস কুইক কমফরটস’ বইটির জন্যও বিবিসি সিরিজ তৈরি করবে না।
ইনস্টাগ্রামে অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে তিনি ইন্ডাস্ট্রির গ্যাসলাইটিং তুলে ধরেন। একজন মুসলিম নারী হিসেবে সবসময় যথেষ্ট সমর্থন বা সুযোগ পাননি। সফল মিডিয়া ব্যক্তিরা সাধারণত এমন পোস্ট করেন না, যা তাঁর নির্ভীকতা আরও রোমাঞ্চকর করে।
গত বছর তাঁর জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সাক্ষাৎকারে বলেন, এ সময় নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভেবে বুঝেছেন নিজের মতো পথ তৈরি করতে চান। আগে ‘সহজে গ্রহণযোগ্য’ হয়ে অস্বস্তি বোধ করতেন। টিভি-প্রকাশনায় ভিন্ন পরিচয়ের মানুষ হিসেবে একাকিত্ব অনুভব করেছেন। ইন্ডাস্ট্রি সবসময় সঠিক নয়, বদলাতেও পারবেন না।
ধর্ম-সংস্কৃতি তাঁর পরিচয়ের অংশ হলেও অনেকের কাছে অস্বস্তির কারণ। ‘রুজা’ বইয়ের পর কাজ বা ব্র্যান্ড সহযোগিতা কম পান, তবু গর্বিত। টিভি-প্রকাশনা তাঁকে নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে দিয়েছে, যেখানে নিজের মতো থাকতে পারেননি। মানিয়ে নিতে হেডস্কার্ফ পরার ধরনও বদলেছেন। এখন নিজের মতো থাকতে চান।
অতীতে বৈষম্য বা খারাপ আচরণ এড়িয়ে গেছেন অন্যের পরামর্শে, যা নিয়ে আফসোস করেন। অভিযোগ করলে ‘ঝামেলাপূর্ণ’ মনে হবে ভেবে চুপ ছিলেন। গায়ের রং নিয়েও ভুগেছেন। কাজ পাওয়ার জন্য সবসময় ‘কৃতজ্ঞতা’ প্রকাশ করতে হতো। সমালোচনা এসেছে সব কাজে, সোশ্যাল মিডিয়াতেও ‘অকৃতজ্ঞ’ বলা হয়েছে।
এখন মানুষ বর্ণবাদী মন্তব্য বাড়িয়েছে, তবু ইতিবাচক কণ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ। একই কাজে শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় কম পারিশ্রমিক পেয়েছেন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তৃতীয় হিসেবে বড় হয়েছেন। আগের প্রজন্মের নারীরা গৃহিণী ছিলেন, সন্তুষ্ট মনে হয়নি। সমাজকর্মী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরিবার সুযোগ দেয়নি। বিয়ে পথ তৈরি করে, ‘ফাইন্ডিং মাই ভয়েস’ বইয়ে বোঝা যায় তিনি নিয়ন্ত্রণে থাকতে চাননি।
পরে ডিগ্রি নেন, পরিবারের প্রথম নারী। স্বামী ‘বেক অফ’-এ আবেদনের উৎসাহ দেন, যা জীবন বদলে দেয়। প্রকাশ্যে বর্ণবাদ, মানসিক স্বাস্থ্য, যৌন নির্যাতনের কথা বলেছেন। আত্মজীবনীতে শৈশবের ঘটনা উল্লেখ করেছেন, পরিবার কখনো আলোচনা করেনি—সংস্কৃতিতে এসব নিয়ে কথা হয় না। নীরবতা লজ্জা ও ‘নাম রক্ষা’ থেকে, পুরুষদের বেশি সুরক্ষা পায়।
৪১ বছর বয়সী নাদিয়ার এক ছেলে নিজের মতো থাকছে, আরেক ছেলে এবছর বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবে, ১৫ বছরের মেয়ে আছে। সন্তানদের জন্য পছন্দের রান্না করেন। ‘সন্তানদের দেখা দরকার যে সাহসী সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।’ গত বছর শিখেছেন সত্য বলা গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। প্রাইমারি স্কুলে টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিলেন, স্বাস্থ্যে চালাতে পারেননি। পড়াশোনা কাজে লাগাতে চান, খাবারকেন্দ্রিক টিভি শো করতে চান। আগে সেট-সাজসজ্জায় বেশি গুরুত্ব, রেসিপিতে পুরোপুরি যুক্ত থাকতেন না। এখন খাবারকেন্দ্রিক কাজ, শিশুদের বই চান। ‘আমি এমন একটা জায়গা তৈরি করতে চাই, যেখানে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করব। থাকব নিজের শর্তে, নিজের মতো করে।’
সূত্র: গার্ডিয়ান






