ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকার গোকর্ণঘাটের তিতাস নদে মায়ের সঙ্গে ২৬ মার্চ সকাল আটটার দিকে পুণ্যস্নান করতে যায় অপর্ণা সূত্রধর। ভিড়ের মধ্যে মায়ের হাত থেকে ছিটকে গিয়ে নদের স্রোতে ভেসে যায় শিশু অপর্ণা।
অপর্ণা একা নয়। গত ১৪ থেকে ২৮ মার্চ ঈদের ছুটিতে অর্থাৎ ১৪ দিনে মোট ৫০ জন প্রাণবন্ত শিশু ডুবে মারা গেছে। হিসাব কষলে দেখা যায়, গড়ে প্রতিদিন চার শিশু পানিতে ডুবে মারা গেছে। দেওয়ানগঞ্জে সাঁকো দুর্ঘটনায় একসঙ্গে পাঁচ শিশু পানিতে হারিয়ে যায় বড়দের সঙ্গে ঈদে বেড়াতে গিয়ে। তা ছাড়া মোট আটটি স্থানে একসঙ্গে দুজন করে শিশু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
ছুটির দিনে দল বেঁধে খেলাধুলা-চলাফেরা করায় শিশুরা একে অন্যকে বাঁচাতে গিয়ে প্রায়ই পানিতে ডুবে একসঙ্গে মারা যায়। এবারও এমন ঘটনা কমপক্ষে আটটি ক্ষেত্রে ঘটে, যাতে মোট ১৬ জন শিশু মারা যায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এরা একই পরিবারের আপন বা নিকট সম্পর্কের ভাই–বোন।
অপর্ণা একা নয়। গত ১৪ থেকে ২৮ মার্চ ঈদের ছুটিতে অর্থাৎ ১৪ দিনে মোট ৫০ জন প্রাণবন্ত শিশু ডুবে মারা গেছে। হিসাব কষলে দেখা যাবে, গড়ে প্রতিদিন চার শিশু মারা গেছে পানিতে ডুবে।
৫০ জনের মধ্যে ২০ জন শিশুর বয়স ৫ বছরের কম, অর্থাৎ তাদের সাঁতার শেখার বয়সও হয়নি। সবচেয়ে কম বয়সী শিশুটি নানার বাড়ির বাথরুমে বালতির পানিতে ডুবে মারা যায়। শিশু আবরাহাম তার প্রথম জন্মদিনের আগেই চলে যায়।
লম্বা ছুটিতে নানাবাড়ি, দাদাবাড়ি বা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে আকছার পানিতে শিশুরা ডুবে মারা যাচ্ছে। গবেষণা ও পরিসংখ্যান অনুসারে, সারা বছর যত শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়, তার ৩৫ শতাংশ বিভিন্ন লম্বা ছুটিতে আত্মীয়স্বজনের বাসায় বেড়াতে গিয়ে মারা যায়। ডুবে যাওয়া শিশুদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশের আগে থেকেই খিঁচুনি এবং শ্বাসকষ্টের প্রবণতা ছিল বলে জানা গেছে।
আগের দুই বছরেও পরিস্থিতি একই রকম ছিল। গত ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত ঈদের ছুটিতে, অর্থাৎ ১২ দিনে মোট ৪৯ জন পানিতে ডুবে মারা যায়। সেবারও গড়ে প্রতিদিন চারজন পানিতে ডুবে মারা যায়। মৃতদের ৪৭ জন ছিল শিশু (ছেলেশিশু ৩০ ও মেয়েশিশু ১৭ জন)। এককভাবে ১০ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, মোট ৩৭ জন (১৫ জনের বয়স মাত্র চার বছরের মধ্যে)। বেশির ভাগই মারা যায় বাড়ির কাছের পুকুরে (২৫ জন) এবং আশপাশের নদীতে (১৩ জন)।
তার আগের বছর ২০২৪ সালে পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা পবিত্র ঈদুল ফিতরে ৫৮ জন ও ঈদুল আজহায় ৬৫ জন। সেই বছর দুই ঈদে এককভাবে ছেলেশিশুর মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি ছিল (মোট ৭৮ জন)।
এসব হিসাব সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা। এর বাইরেও অনেক ঘটনা থাকতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ/পৌর করপোরেশন/সভা শিশুদের জন্মনিবন্ধন করলেও মৃত্যুনিবন্ধন হয় না। শিশুরা সম্পত্তির মালিক না হওয়ায় তাদের মৃত্যুনিবন্ধনে কারও গরজ পড়ে না। সংবাদমাধ্যমের এক বেলার খবর ছাড়া এসব মৃত্যুর কোনো রেকর্ড রাখা হয় না। হাসপাতাল বলে দেয়, আনার আগেই মারা গেছে। তাই নামধাম ও কারণ খাতায় তোলার প্রয়োজন হয় না। শিশুদের দল নেই, ভোট নেই, তাই তাদের পক্ষে কেউ নেই। তাদের জন্য শাহবাগেও কেউ বসবে না, শাপলা চত্বরেও কেউ যাবে না। জবাবদিহির কোনো বালাই নেই।
পানি থেকে উদ্ধার করা শিশুদের বয়সভিত্তিক চিকিৎসা প্রটোকল থাকা উচিত এবং এটাকে প্রশিক্ষণে অঙ্গীভূত করা দরকার। পানিতে ডুবে মারা যাওয়া শিশুর ময়নাতদন্ত হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন। কোনো শিশু যে পানিতে ডোবার নামে হত্যার শিকার হয়নি, সেটা কেউ হলফ করে বলতে পারবে কি? প্রতিটি অপমৃত্যুর ময়নাতদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। যেকোনো অপমৃত্যুর কিনারা করতে ময়নাতদন্ত আবশ্যিক। ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ বা সাবধানতার ক্ষেত্রে এটি অনেক সূত্র দিতে পারে। ময়নাতদন্ত নিয়ে আমাদের ফালতু আবেগ আছে, যা ইতিবাচক ফল দেয় না, সেটা বুঝতে হবে।
অনেকে না জেনে পানি থেকে তুলে আনা শিশুকে উল্টো করে শুইয়ে পেটে চাপ দিয়ে পানি বের করার চেষ্টা করেন, এটা মোটেও ঠিক নয়। এতে শিশু বমি করে ফেলতে পারে, যা ফুসফুসে প্রবেশ করে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। ডুবে যাওয়া শিশুকে মাথার ওপর ঘোরানো বা অবিরাম তেল মালিশও বিপজ্জনক। তেল মালিশে ভেসোডাইলেটেশন বেড়ে রোগী শকে চলে যেতে পারে, ভেইন কলাপ্স করতে পারে।
পরিবার চাক বা না-ই চাক, প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে গাফিলতির জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের আলামত পাওয়া গেলে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে হবে। ডুবে মরা প্রত্যেক শিশু/ব্যক্তির ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে।
প্রকল্পের ধান্ধায় অনেকে সাঁতার শেখানোর পক্ষে ওকালতি করেন, কিন্তু তথ্য বলছে বেশির ভাগ শিশু সাঁতার শেখার বয়স হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে। বাবা-মাকে শিশুদের সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার চাক বা না-ই চাক, প্রতিটি ঘটনা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে গাফিলতির জায়গা চিহ্নিত করতে হবে। অবহেলাজনিত হত্যাকাণ্ডের আলামত পেলে আইনের আওতায় আনতে হবে। ডুবে মরা প্রত্যেক শিশু/ব্যক্তির ময়নাতদন্ত বাধ্যতামূলক করতে হবে।
কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে পানি থেকে উদ্ধার ও প্রাথমিক শুশ্রূষার প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ছুটির আনন্দ উপভোগ্য করতে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিশেষ নজরদারি করতে হবে। গবেষণা বলছে, মা বা তত্ত্বাবধায়কের ১০০ গজ দূরত্বের মধ্যেই শিশু ডুবে মারা যায়। বেশির ভাগ ঘটনা দুপুর ১২টা থেকে বেলা ৩টার মধ্যে ঘটে, যখন মায়েরা ঘরকন্নায় ব্যস্ত। এ সময় নজরদারি বাড়ালে অনেক দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব।
যেসব শিশুর সামান্য খিঁচুনির ঝোঁক, তাদের পূর্ণবয়স্ক তত্ত্বাবধান ছাড়া পানি, আগুন (বাজি পোড়ানো), গাছে চড়া ইত্যাদিতে যেতে দেওয়া যাবে না। চিকিৎসকের পরামর্শে খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণের ওষুধ খাওয়া শিশুদের সঙ্গে ওষুধ রাখতে হবে।
শিশুমৃত্যু শুধু টিকা, ওষুধ বা হাসপাতাল দিয়ে কমানো যাবে না। শিশু সংবেদনশীলতাই অকালমৃত্যু ঠেকাতে পারবে। শিশু হারাবে না জলে। খুঁজতে হবে না সেই শিশুকে যে সাহসের সঙ্গে প্রশ্ন করবে, ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়?’ অথবা বলবে রাজা তোর সংবিধান কই?
# লেখক গবেষক [email protected]






