দেশে হামের সংক্রমণের হার ১৬.৮। কিন্তু বরগুনা সদর উপজেলায় এই হার ২৯৪.৫। দেশের অন্য কোনো জায়গায় এত বেশি সংক্রমণ নেই।
বরগুনা সদর হাসপাতালের টিকাকেন্দ্রে গতকাল রোববার সকাল ৮টায় হাম-রুবেলার টিকাদান শুরু হয়। কিন্তু বিকেল ৪টার আগেই কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। কেন বন্ধ হলো, সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো কোনো কর্মী বিকেল পৌনে ৪টায় পাওয়া যায়নি।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) উপপরিচালক শাহরিয়ার সাজ্জাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শিশুদের হাম-রুবেলা প্রতিরোধে জরুরি টিকাদান কেন্দ্রগুলো প্রতিদিন সকাল ৮টায় খুলবে, চলবে বিকেল ৪টায় পর্যন্ত। ৪টার সময় কোনো শিশুকে টিকা দেওয়া হলে কেন্দ্রটি আরও আধা ঘণ্টা খোলা থাকবে শিশুটিকে পর্যবেক্ষণের জন্য।
ছোট টিকাদান কক্ষে জনাবিশেক মানুষের ঠেলাঠেলি। এর মধ্যে ছয়জন নার্স শিশুর নাম লেখা, আগে টিকা দিয়েছে কি না তা যাচাই, তালিকায় নাম তোলা, ভায়াল ভাঙা ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত। কয়েকজন মা-বাবা সঙ্গে একটি করে শিশু নিয়ে আছেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও উপস্থিত।
দেশের ১৮টি জেলার ৩০টি উপজেলায় হামের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। ইপিআইয়ের হিসাবে সারা দেশে সংক্রমণের হার সবচেয়ে বেশি বরগুনা সদর উপজেলায়। তবে এখানে টিকাদানের আয়োজনে ঘাটতি লক্ষ্য করা গেছে। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নেই।
বরগুনার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবুল ফাত্তাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এ বছর জেলায় এ পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়েছে ১৪০ জন। এর মধ্যে ৩৩ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছে। তিনজন মারা গেছে। অন্যরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছে, দেশে হামের সংক্রমণের হার ১৬.৮। এর অর্থ প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে ১৬.৮ জন হামে আক্রান্ত। অন্যদিকে ইপিআই জানিয়েছে, বরগুনা সদরে সংক্রমণের হার ২৯৪.৫, অর্থাৎ প্রতি ১০ লাখে ২৯৪.৫ জন আক্রান্ত। দেশে আর কোথাও এত বেশি নেই।
গতকাল সকাল ১০টায় বরগুনা সদর হাসপাতালে গিয়ে মানুষের ভিড় দেখা যায়। প্রায় প্রতিদিনই এমন ভিড় থাকে। হাসপাতালের পুরোনো ভবনের নিচে টিকাকেন্দ্রেও ভিড়। ছোট কক্ষে জনাবিশেকের ঠেলাঠেলি। ছয়জন নার্স নাম লেখা, আগের টিকা যাচাই, তালিকা তৈরি, ভায়াল ভাঙা কাজে ব্যস্ত। কয়েকজন মা-বাবা শিশু নিয়ে, গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত।
টিকা নিতে আসা শিশু তৌহিদের বয়স দেড় বছর। মায়ের কোলে বসে হাসিখুশি ছিল। ৪ নম্বর কেওড়াবুনিয়া ইউনিয়ন থেকে এসেছে। পায়ে টিকা দিতেই চিৎকার। দু-তিন মিনিটে কান্না থামে। মা তাকে নিয়ে চলে যান। এভাবে একের পর এক শিশুকে টিকা দেওয়া চলে। তখন পর্যন্ত ৪০টি শিশু টিকা পেয়েছে। সারাদিনে কেন্দ্রে ২১৮টি শিশু টিকা নেয়।
হাসপাতালের নতুন ভবনের পঞ্চম তলায় হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড। গণমাধ্যমকর্মীসহ সাধারণ মানুষের যাতায়াতে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই।
পাশের শয্যায় ঘুমিয়ে ছিল তাহসিন। বয়স এক বছর। পাশে তার নানি। নানি বলেন, তাহসিনের জ্বর-সর্দি হলে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। জ্বর ভালো হওয়ার আগেই হাম দেখা দেয়। তাহসিনের নানির ধারণা, হাসপাতাল থেকেই সংক্রমণ হয়েছে।
মুসার বয়স ছয় মাস। মা নূপুর (২৮) তাকে নিয়ে বসে আছেন। বাড়ি বরগুনা সদরের বুড়িরচর ইউনিয়ন। নূপুর বলেন, মুসা দ্বিতীয় সন্তান। এলাকায় অন্য শিশুর হামের খবর শোনেননি। কোথা থেকে হাম, বুঝতে পারছেন না। নিজে হামের টিকা নিয়েছেন কি না, মনে নেই। মুখে দুশ্চিন্তা।
টিকাকেন্দ্র ও হাসপাতালে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, হাম নিয়ে উদ্বিগ্ন। কিন্তু শিশুদের টিকায় অমনোযোগী। কেউ বলতে পারেননি আগে টিকা দিয়েছিলেন কি না।
চরকলোনি হামিদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় টিকাকেন্দ্রের সামনে মোহাম্মদ মামুনের সঙ্গে দেখা। তিনি ৪ বছরের মেয়েকে টিকা দিতে এনেছেন। ৯ মাসে প্রথম ডোজ, ১৫ মাসে দ্বিতীয় ডোজ হয়নি। কেন, বলেন, ‘দেওয়া হয়নি আরকি’।
বেলা সাড়ে ৩টায় চরকলোনি হামিদিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে তিনজন কর্মী। চেয়ার-টেবিল নেই, বারান্দার দেয়াল ব্যবহার করছেন। কর্মীরা জানান, প্রথম দিনের লক্ষ্য ২২০ জন। তখন পর্যন্ত ১১০টি শিশু এসেছে, লক্ষ্য পূরণ হবে না।
বেলা ৩টায় বরগুনা পৌর কার্যালয়ের কেন্দ্র বন্ধ। গতকাল জেলায় ১ হাজার ৮৮৪টি শিশু টিকা পেয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরগুনা সদর ও পৌরসভায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ২৭ হাজার শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য। সদরে ১৫টি, পৌরসভায় ৫টি কেন্দ্র। ভিড় কমের কারণ, অনেক অভিভাবক জানেন না কর্মসূচি চলছে। শহরে ব্যানার-ফেস্টুন বা মাইকিং নেই। এক কেন্দ্রে চেয়ার-টেবিলও নেই।
এসব অভিযোগে সিভিল সার্জন বলেন, খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে জরুরি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রচার করা হবে। সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে দূর করা হবে।
গতকাল বেলা ১১টায় সিভিল সার্জন কার্যালয়ে টিকা কর্মসূচির উদ্বোধন হয়। জেলা সিভিল সার্জন আবুল ফাত্তাহ বলেন, গত বছর জেলায় ব্যাপক ডেঙ্গু দেখা দিয়েছিল। এ বছর হাম। ডেঙ্গু প্রতিরোধের শিক্ষা হামে কাজে লাগাতে হবে।
অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীরা অভিযোগ করেন, জরুরি কর্মসূচি নিয়ে মানুষ-সাংবাদিক বিভ্রান্ত। কেন্দ্রের সংখ্যা, সময়, দৈর্ঘ্য জানা যায় না। প্রচার নেই।
এসব অভিযোগে সিভিল সার্জন বলেন, খুব অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে জরুরি কর্মসূচি শুরু হয়েছে। প্রচার করা হবে। সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে দূর করা হবে।
গতকাল বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র জানিয়েছে, সারা দেশে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ১৭ জনের। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগের ৫টি শিশু, তিনজন বরগুনার। অর্থাৎ মোট মৃত্যুর ১৮ শতাংশ এই জেলায়।
জেলা সিভিল সার্জন জানান, তিন শিশুর একজন পাথরঘাটা উপজেলার, দুজন সদরের। একজন মারা যায় ঢাকার সংক্রামক রোগ হাসপাতালে, একজন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, অন্যজন বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে।






