জাতীয় সংসদ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি দুটি অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে। আজ রোববার সংসদে এসবক্রান্ত দুটি আলাদা বিল পাস হয়েছে। এর ফলে ওই অধ্যাদেশ দুটি এখন আইনে রূপান্তরিত হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিত এবং ১৫টি সংশোধিত করে সংসদে অনুমোদনের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা এবং ১৬টি পরবর্তী সময়ে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
আজ থেকে সংসদ অধ্যাদেশগুলো অনুমোদনের জন্য বিল পাস শুরু করেছে। আজকের দুটি বিলের ক্ষেত্রে বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছিল অধ্যাদেশগুলো অপরিবর্তিত রাখা। এই দুটি বিলের মাধ্যমে মোট চারটি অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়েছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী আলাদাভাবে দুটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন। কোনো বিলেই কোনো সংশোধনী প্রস্তাব ছিল না, তাই আলোচনা হয়নি।
‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল’ এবং ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশন স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ বিল’ কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিল দুটি পাসে মাত্র আট মিনিট সময় লেগেছে। কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের সদস্যরা ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কিছুই বলেননি।
সম্পূরক কার্যসূচির মাধ্যমে দুটি বিল উত্থাপনের বিষয়টি সংসদ সদস্যদের জানানো হয়। পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সম্পূরক কার্যসূচিতে কিছু বিল আনা হয়েছে। ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিয়ে বিশেষ কমিটি প্রতিবেদন দিয়েছে। কিছু অধ্যাদেশ ল্যাপস (বাতিল) করা হয়েছে। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ এবং জুলাই চেতনার সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাঁরা বিষয়টি নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে চান।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, বিল দুটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে পরে তিনি বক্তব্য সংশোধন করে বলেন, এ দুটি বিল ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
তখন বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, তাঁরা চান, যেসব অধ্যাদেশ ল্যাপস করার কথা বলা হয়েছে, প্রতিটি বিষয় সংসদে উত্থাপন করা হোক। তাঁরা সেটাতে আলোচনায় অংশ নিতে চান।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশ সংসদে তোলা হবে। সেখানে আলোচনার সুযোগ থাকবে। আজ (রোববার) যে দুটি বিল আনা হয়েছে, সে দুটির বিষয়ে বিশেষ কমিটি নিঃশর্তভাবে পাস করার বিষয়ে সর্বসম্মত হয়েছিল।
পরে একপর্যায়ে সরকারি চাকরি বিল অনুমোদনের জন্য আইনমন্ত্রী এটি তোলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদকে জানান, বিলের ওপর দফাওয়ারি কোনো সংশোধনী প্রস্তাব নেই। তিনি বিলের দফাগুলো সরাসরি ভোটে দেন। কণ্ঠভোটে দফাগুলো পাস হয়। একই প্রক্রিয়ায় অন্য বিলটিও পাস হয়।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩২ বছর
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ–সংবলিত বিবৃতিতে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি চাকরিতে চাকরিপ্রার্থীদের প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর দাবি এবং বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল কর্পোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাসমূহে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা নির্ধারণ অধ্যাদেশ, ২০২৪’–এ সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের বয়সসীমা দুই বছর বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়। কিন্তু কিছু নিয়োগবিধিতে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩৩-৪৫ নির্ধারিত আছে। এতে নিয়োগে জটিলতা তৈরি হয়। জটিলতা নিরসনে ২০২৫ সালে অধ্যাদেশটি অধিকতর সংশোধন করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে (বিসিএস) সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর রেখে সার্কুলার জারি করে নিয়োগপ্রক্রিয়া চালু রয়েছে বিধায় অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা আবশ্যক।
এই আইন অনুযায়ী, বিসিএসের সব ক্যাডারে ও ক্যাডারবহির্ভূত সব সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা হবে ৩২ বছর। এ ছাড়া স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফাইন্যান্সিয়াল করপোরেশনসহ স্বশাসিত সংস্থাগুলোর চাকরির সব পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রেও বয়সসীমা ৩২ বছর হবে।
সরকারি চাকরি আইন
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালে সরকারি চাকরি আইন সংশোধন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল। পরে আবার সেটাতে সংশোধনী এনে অধ্যাদেশ করা হয়েছিল। ওই দুটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে আনা সংশোধনী হুবহু রেখে আজ ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল-২০২৬’ সংসদে তোলেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী। আলোচনা ছাড়াই বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিলে সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও দণ্ড–সংক্রান্ত বিশেষ বিধান পাস হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বৈধ আদেশ অমান্য করেন, আইনসংগত কারণ ব্যতিরেকে সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র ও নির্দেশ অমান্য করেন বা এর বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করেন বা এসব কাজে অন্য কোনো সরকারি কর্মচারীকে প্ররোচিত করেন, তা হবে অসদাচরণ। ছুটি বা যুক্তিসংগত কোনো কারণ ছাড়া অন্য কর্মচারীদের সঙ্গে সমবেতভাবে নিজের কাজ থেকে অনুপস্থিত বা বিরত থাকাও হবে সরকারি কর্মে বিঘ্ন সৃষ্টিকারী অসদাচরণ। যেকোনো সরকারি কর্মচারীকে তাঁর কর্মে উপস্থিত হতে বা কর্তব্য সম্পাদনে বাধাগ্রস্ত করা হবে অসদাচরণ।
এ ধরনের অসদাচরণের জন্য নিম্নপদ বা নিম্ন বেতন গ্রেডে অবনমিতকরণ, বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া ও চাকরি থেকে বরখাস্ত করার বিধান আছে।






