২০ দিনে সন্দেহজনক হামে ৯৮ শিশুর মৃত্যু।
নিশ্চিত হামে মৃত্যুর সংখ্যা ১৬।
২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামে মৃত্যু ৪ জনের।
নিশ্চিত হামে মৃত্যু ২ জনের।
চলতি বছরে হামে যত মৃত্যু হয়েছে, তা গত দুই দশকে সর্বোচ্চ। এই সময়ে পাঁচবার হামে মৃত্যুর ঘটনা জানা যায়। ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি মারা যায় ১০ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সর্বশেষ ২০ দিনে (১৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল) ৯৮ শিশু সন্দেহজনক হাম রোগে মারা গেছে। আর হামে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ১৬। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগে চারজন এবং নিশ্চিত হামে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে গত দুই সপ্তাহে মুক্তকণ্ঠ দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামে মৃত্যুর সংখ্যা ৬১ বলে জেনেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে হামে প্রতিবছর কতজন আক্রান্ত হয়, তার হিসাব নিয়মিত করা হলেও মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় না। দেশে হামে মৃত্যুর হার ছিল ১০ লাখে ১ শতাংশ। এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ।
.আমি যতটুকু অনুমান করতে পারি, দেশে হামে এ পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে এত রোগীর মৃত্যু হয়নি।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২০ দিনে ৮২৬ জন নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়েছে। আর সন্দেহজনক হামে আক্রান্তের সংখ্যা ৪ হাজার ৬২৮। যদি ৮২৬ জনের হিসাব ধরে নেওয়া হয়, তবে সেই সংখ্যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর আগে ২০২০ সালে দেশে হামে আক্রান্ত হয়েছিল ২ হাজার ৪১০ জন। পরের বছরগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা ৪০০-এর কম ছিল।
স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশে হামের টিকা শুরুর পর এ রোগে এত মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার পরিচালক অধ্যাপক হালিমুর রশিদ গতকাল শনিবার মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যতটুকু অনুমান করতে পারি, দেশে হামে এ পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে এত রোগীর মৃত্যু হয়নি।’
.৩ মিনিটে জেনে নিন হামের চিকিৎসা ও করণীয়.হামে মৃত্যু, রেকর্ড যা বলছে
দেশে হামের সার্ভিল্যান্স বা নিরীক্ষণ হয় ডব্লিউএইচওর সহযোগিতায়। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) পক্ষ থেকে এ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
টিকা বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. তাজুল ইসলাম এ বারী জানান, এর আগে দেশে ২০১৬ সালে হামে একজনের মৃত্যু হয়েছিল। পরের বছর চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১০ ত্রিপুরা শিশুর মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালেও চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে ৬ শিশুর মৃত্যু হয়। তবে তাদের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি। তাদের মৃত্যুর পর ‘ভারবাল অটোপসি’র মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে হয়েছিল।
কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর যখন চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ সনদ বা হাসপাতালের নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না, তখন তার পরিবারের সদস্য বা নিকটজনের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মৃত্যুর সম্ভাব্য কারণ নির্ধারণের পদ্ধতি হলো ভারবাল অটোপসি।
তাজুল ইসলাম জানান, ২০২০ সালে পার্বত্য জেলা বান্দরবানে ৭ শিশুর মৃত্যু হয় হামে। এরপর আর দেশে হামে এত মৃত্যুর রেকর্ড নেই।
.জরিপে যুক্ত ছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি জানান, দেশব্যাপী দৈবচয়নের ভিত্তিতে করা ওই জরিপে মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল। সেই বিচারে বলা যায়, এবার হামে যত মানুষের মৃত্যু হলো, তা এ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।.
২০০৬ সালে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পক্ষ থেকে হামে আক্রান্ত ও এতে মৃত্যুর সংখ্যা নির্ণয়ে একটি জরিপ হয়। ডব্লিউএইচওর অর্থায়নে এ জরিপে নেতৃত্ব দেন আইইডিসিআরের তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান। তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘ওই সময় চারজনের মৃত্যুর তথ্য আমরা পাই।’
জরিপে যুক্ত ছিলেন জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি জানান, দেশব্যাপী দৈবচয়নের ভিত্তিতে করা ওই জরিপে মৃত্যুর সংখ্যা কম ছিল। সেই বিচারে বলা যায়, এবার হামে যত মানুষের মৃত্যু হলো, তা এ দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
.৩ মিনিটে জেনে নিন হামের চিকিৎসা ও করণীয়.হামে সংক্রমণ: ২০০৪ থেকে এখন
হাম পরিস্থিতিকে বোঝার জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা দেখা দরকার বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। ডব্লিউএইচওর দেওয়া বাংলাদেশ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত অনুযায়ী, ২০০৪ সালে দেশে ৯ হাজার ৭৪৩টি হাম রোগীর তথ্য পাওয়া যায়। পরের বছর বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার ৯৩৪; যা ওই সময়ের বড় প্রাদুর্ভাবের ইঙ্গিত দেয়। এরপর ২০০৬ সালে তা নেমে আসে ৬ হাজার ১৯২-এ। ২০০৭ সালে ২ হাজার ৯২৪, ২০০৮-এ ২ হাজার ৬৬০, ২০০৯-এ ৭১৮, আর ২০১০ সালে ৭৮৮। অর্থাৎ ২০০৪ থেকে ২০০৫-এর ভয়াবহ অবস্থার পর আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত কমে আসে।
এরপরও বাংলাদেশ হামকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ডব্লিউএইচওর পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১১ সালে দেশে হাম রোগীর সংখ্যা আবার লাফ দিয়ে ৫ হাজার ৬২৫-এ ওঠে। ২০১২ সালে তা ১ হাজার ৯৮৬-এ নেমে আসে। ২০১৩ সালে ২৩৭, ২০১৪ সালে ২৮৯, ২০১৫ সালে ২৪০—এই তিন বছর তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় ছিল। কিন্তু ২০১৬ সালে আবার আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে হয় ৯৭২। পর্যালোচনা বলছে, ২০০০ থেকে ২০১৬ সময়ে টিকাদান বাড়লেও ২০১৬ সালে আবার প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
.ইপিআই কর্মসূচির শুরুতে ৬টি সংক্রামক রোগ—যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও ও হামের টিকা দেওয়া হতো। পরে হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, রুবেলা এবং নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া টিকাও যুক্ত করা হয় এ কর্মসূচিতে।.
‘পিছিয়ে গেল দেশ’
দেশে দুই দফায় শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হয়। প্রথমে ৯ মাসে, পরে ১৫ মাস বয়সে দেওয়া হয় দ্বিতীয় ডোজ। প্রথমে হামের টিকা এক ডোজ দেওয়া হতো। ২০১২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় ডোজের হামের টিকা দেওয়া শুরু হয়।
দেশে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। প্রাথমিক পর্যায়ে শহরাঞ্চলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। পরে ১৯৮৫ সাল থেকে সম্প্রসারিত আকারে দেশের গ্রামাঞ্চলেও এই কার্যক্রম চলতে থাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) মাধ্যমে।
.হামে আক্রান্ত শিশু রোগী বাড়ছে.ইপিআই কর্মসূচির শুরুতে ৬টি সংক্রামক রোগ—যক্ষ্মা, ডিফথেরিয়া, হুপিং কাশি, ধনুষ্টংকার, পোলিও ও হামের টিকা দেওয়া হতো। পরে হেপাটাইটিস বি, হিমোফাইলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা, রুবেলা এবং নিউমোক্কাল নিউমোনিয়া টিকাও যুক্ত করা হয় এ কর্মসূচিতে।
.গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেখান থেকে পিছিয়ে গেল দেশ।ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান
ইপিআই শুরুর ৬ বছর পর ১৯৮৫ সালে দেশের মাত্র ২ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। ইপিআই কভারেজ ইভাল্যুয়েশন সার্ভে ২০১৯-এর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই হার এখন ৮৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
চলতি বছর হাম বৃদ্ধির পেছনে গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে টিকাদানের নিম্নহারকেই প্রধান কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কমিটি অব মিজেলস অ্যান্ড রুবেলা এলিমিনেশনের প্রধান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘গত বছর আমাদের বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হামের টিকা দেওয়া হয়নি পর্যাপ্ত। অথচ গত বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে হাম দূরীকরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছিল। সেখান থেকে পিছিয়ে গেল দেশ।’






