শনিবার দিবাগত রাত দুইটা। ঢাকা শহর ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মানুষের চোখে ঘুম নেই। উত্তরের মহাখালী থেকে দক্ষিণের তেজগাঁও পর্যন্ত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। হেডলাইটের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে আছে ক্লান্ত মুখগুলো, যা তেলের সংকটের অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি。

রায়েরবাগ থেকে আসা মোটরসাইকেল চালক কামরুল হাসানের চোখে ক্লান্তি। ১৫ কিলোমিটার দূর থেকে শনিবার রাত নয়টায় লাইনে দাঁড়ান। ৬০০ টাকার তেল হাতে পাওয়া যায় সোয়া চারটায়, প্রায় ভোর হয়ে গেছে। সাড়ে সাত ঘণ্টার অপেক্ষার পর তিনি মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তেজগাঁওয়ের এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং রায়েরবাগ থেকে বাইকে যাতায়াত করেন। তেলের সংকটে পাম্পগুলো চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল দিচ্ছে, এই অল্প তেলে বড়জোর দুই-তিন দিন চলে। কামরুল আপশোস করে বলেন, ‘সপ্তাহে তিন দিন যদি এভাবে সাত-আট ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে তো জিন্দেগি শেষ!’

দীর্ঘ অপেক্ষা

ট্রাস্ট পাম্প থেকে শুরু হয়ে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজের সামনে পর্যন্ত লাইন। এতে ৪৮৩টি মোটরসাইকেল, ৩৬৯টি ব্যক্তিগত গাড়ি এবং ৩১টি পণ্যবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ক্লান্তিতে কেউ বাইকের উপর মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে, কেউ মোবাইলে লুডু খেলছে, অনেকে সড়কবিভাজকের উপর বসে সময় কাটাচ্ছে।

সরবরাহ বনাম আতঙ্ক

পাম্পের সহকারী সেলস সুপারভাইজার মাসুদ কবির জানান, আগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৫২ হাজার লিটার জ্বালানি পেতেন, এখন ৩৭ থেকে ৪০ হাজার লিটার। রিজার্ভারে যান্ত্রিক কারণে দেড় থেকে দুই হাজার লিটার তেল রাখতে হয়। কিন্তু মানুষ আতঙ্কে আছে, অর্ধেক পূর্ণ ট্যাঙ্ক নিয়ে ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়ে লাইনে দাঁড়াচ্ছে। কর্মীরা বলছেন, মানুষের মধ্যে ‘প্যানিক বায়িং’ তৈরি হয়েছে। কেউ বলছেন মা অসুস্থ গ্রামে যেতে হবে, কেউ জরুরি পণ্য সরবরাহের কথা বলছেন। বিশৃঙ্খলা এড়াতে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকের জন্য আলাদা লাইন করা হয়েছে, তবু ভিড় সামলানো কঠিন। ক্ষুধার্তদের জন্য ঝালমুড়ি, শিঙারা-সমুচা, রুটি-সবজি, চা-সিগারেটের দোকান গড়ে উঠেছে।

শৌচাগারে ভিড়

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পাশের এই পাম্পে পরিচ্ছন্নতার জন্য ভ্রাম্যমাণ শৌচাগার বসানো হয়েছে, সেখানে ভিড় এত বেশি যেন কোনো সমাবেশ চলছে।

চালকদের হাহাকার

ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে উবার চালক শাহীন খান বলেন, বিজয় সরণির আগে অন্য পাম্পে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়েছিলেন, তেল শেষ হয়ে যায়। তাঁর ধারণা, পাম্প মালিকেরা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ক্ষুব্ধ শাহীন বলেন, ‘তেলের দাম বাড়িয়ে দিলেও তো এই ভোগান্তি থেকে মুক্তি পাইতাম। এখন তো সময়ও যাচ্ছে, কাজও করতে পারছি না।’ আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র। ঝিনাইদহের শামীম মধ্যবাড্ডায় থাকেন, রাত দেড়টায় লাইনে ছিলেন। দুই দিন আগে আবদুল্লাহপুরে রাত নয়টা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন।

নিয়ন্ত্রিত তেল বিক্রি

চাহিদা-জোগানের ভারসাম্য রক্ষায় পাম্পগুলো নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। বিজয় সরণির পাম্পে প্রাইভেট কারের জন্য সর্বোচ্চ ২ হাজার ৪০০ টাকা, মোটরসাইকেলে ৬০০ টাকা এবং বড় ট্রাকে ১০০ লিটার তেল। ২ হাজার ৪০০ টাকার তেল নিয়ে বের হওয়া তাহমিদুল ইসলাম বলেন, ‘তেল নিতে এসে যে পরিমাণ দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, সেটা কল্পনাতীত। পত্রিকায় বলছে তেল আছে, অথচ পাম্পে এলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়াতে হচ্ছে। আমরা আসলে কার কথা বিশ্বাস করব?’

সমাধানের অপেক্ষায়

রবিবার সকাল সাড়ে ৬টাতেও লাইন কমেনি, নতুন ক্রেতারা যোগ হচ্ছে। চট্টগ্রাম যাওয়ার ট্রাকের চালক জামিল খানের রাতের ঘুম হারাম। তিনি বলেন, সড়কের দুর্ভোগের সঙ্গে তেলের সংকট যোগ হয়েছে, সময়মতো মাল পৌঁছালে না মালিকের গালি খান, কিন্তু সমাধান কে করবে? রাজধানীর বেশিরভাগ পেট্রল পাম্প রাতে বন্ধ, খোলা কয়েকটিতে ভিড়। সাধারণ মানুষ ও পরিবহন শ্রমিকরা স্বাভাবিক সরবরাহ চান। সকালে মুক্তকণ্ঠ ফুটলে কামরুল হাসান বা জামিল খানের মতো শত শত মানুষ এখনো লাইনে দাঁড়িয়ে পরের দিনের তেলের নিশ্চয়তা খুঁজছেন।