শনিবার দুপুরে বাবাকে সঙ্গে নিয়ে কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে এসে পৌঁছালেন বিদুষী বর্ণিতা। আগের রাতেই ‘লাক্স সুপারস্টার ২০২৫’ হয়ে দেশজুড়ে পরিচিত হয়েছেন তিনি। সকাল থেকে বাড়িতে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়। তাঁর মুখ থেকেই লাক্স সুন্দরী হওয়ার গল্প শুনলেন নাজমুল হক।
মেহেবুব আলম ও মেরী ইয়াসমিন দম্পতির একমাত্র কন্যা বিদুষী বর্ণিতা। রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করলেও ঢাকাতেই বড় হয়েছেন তিনি। বাবা রেডিও ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে কাজ করেছেন। মা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। ছায়ানট সংগীত শিক্ষালয়ে গান ও বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী মুনমুন আহমেদের কাছে নাচ শিখেছেন বর্ণিতা। ছোটবেলায় মা-বাবার হাত ধরে শোবিজ যাত্রা শুরু করেন। শিশু শিল্পী হিসেবে নাসির উদ্দীন ইউসুফের ‘গেরিলা’ সিনেমায় অভিনয় করেন। তখন তাঁর বয়স ছয়-সাত বছর। বাবা রেডিও এবিসিতে চাকরি করতেন। সেখানকার জনপ্রিয় শো ‘কি শুনাইলেন কিবরিয়া ভাই’–এর বিজ্ঞাপনে তাঁর কণ্ঠ প্রচারিত হয়। এরপর বেশ কয়েকটি টেলিভিশন নাটক ও বিজ্ঞাপনে অভিনয় করেন। শোবিজে নিয়মিত কাজের আগ্রহ ছিল, কিন্তু সুযোগ আসেনি। শুরুর সময় নিয়ে বর্ণিতা বলেন, অনেক লম্বা একটা সময়, প্রায় আট-নয় বছরের একটা গ্যাপ ছিল। সে সময় অনেক কাজ খুঁজেছি, কিন্তু তেমন সুযোগ পাইনি।
সেই সময় কাঙ্ক্ষিত সুযোগ না পাওয়ায় অভিনয়ের প্রতি তাঁর মনে ক্ষুধা ও আক্ষেপ জমে। সেই অপূর্ণ ইচ্ছা নিয়ে ‘লাক্স সুপারস্টার ২০২৫’–এ অংশ নেন। সাত বছর পর ফিরে আসা এই প্রতিযোগিতার মঞ্চে শেষ হাসি হাসেন তিনিই।
হাসপাতালের বিছানা থেকে
প্রতিযোগিতার রেজিস্ট্রেশন শুরুর সময় অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ছিলেন বর্ণিতা। সেই সময় স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রায় এক মাস হাসপাতালে ছিলাম। একপ্রকার হবে না ভেবেই রেজিস্ট্রেশনটা করেছিলাম। তখন মনে হয়েছিল, এই সময়ই কেন এটা হলো, অন্য সময় হলে হয়তো ভালো করতাম।
তবু নিজের ওপর আস্থা রাখেন। সুস্থ হয়ে প্রস্তুতি নেন। লক্ষাধিক আবেদনকারীর মধ্যে প্রাথমিক বাছাইয়ে ১১ হাজার প্রতিযোগীর মধ্যে স্থান পান। দীর্ঘ যাত্রা শেষে সেরা দশে পৌঁছান। শুরুতে পরিবারকে রেজিস্ট্রেশনের কথা জানাননি; চূড়ান্ত সাফল্যের পর চমক দেওয়ার ইচ্ছা ছিল।
সাত বছর পর ফিরল লাক্স সুপারস্টার, বিজয়ী হলেন রাজশাহীর বিদুষী বর্ণিতা।
আক্ষেপ ঘুচল
প্রথম হতে না পারাটা ছিল বর্ণিতার বড় আক্ষেপ। পড়াশোনা বা অন্য প্রতিযোগিতায় দ্বারপ্রান্তে গিয়ে দ্বিতীয় বা তৃতীয় হয়েছেন। এবার প্রথম হয়ে আক্ষেপ মুছে ফেলেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকে কখনো কোচিং করিনি বা কোনো টিচারের কাছে প্রাইভেট পড়িনি, বাসায় একা পড়তাম। কেন জানি এর প্রভাব আমার মার্কসে পড়ত, হয়তো ডিজার্ভ করতাম ফার্স্ট পজিশন কিন্তু হয়েছি সেকেন্ড (হাসি)।
শুক্রবার রাত তাঁর সব অপ্রাপ্তি মুছে দেয়। বিজয়ের পর ঘুম উধাও। সকাল থেকে বাড়িতে আত্মীয়-শুভাকাঙ্ক্ষীর ভিড়, মোবাইলে হাজারো বার্তা। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুসারী বাড়ছে হু হু করে। এক স্টোরিতে প্রায় ৮০ হাজার ভিউ!
বড়দের সান্নিধ্য
জার্নিতে জয়া আহসান, মেহজাবীন চৌধুরী ও রায়হান রাফীর সান্নিধ্য পান বর্ণিতা। বিশেষ করে জয়া আহসানের অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব অনুপ্রাণিত করে। তিনি বলেন, জয়া আহসান ম্যামের কাছ থেকে অভিনয় শিখতে পারা বা ওনার কাছ থেকে একটা ছোট অ্যাডভাইস পাওয়া—এভাবে দাঁড়াবে, এভাবে কথা বলবে—এগুলো অনেক বড় ব্যাপার। এ ছাড়া মেহজাবীন ম্যাম ও রায়হান রাফী স্যারের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। ভিকি জাহেদ স্যার ও জাহিদ প্রীতম স্যারের প্রজেক্টে কাজ করাও জীবনের অন্যতম বড় সুযোগ হিসেবে দেখছি। তা ছাড়া এই জার্নিতে জাতীয় ফুটবল দলের অধিনায়ক জামাল ভূঁইয়ার মতো বড়মাপের ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে স্ক্রিন শেয়ার করা আমার জন্য অনেক বড় অভিজ্ঞতা।
দায়িত্বের ভার
ট্রফিটি তাঁর কাছে শুধু শোকেসের জিনিস নয়, হাজারো মানুষের ভালোবাসার প্রতীক। তিনি বলেন, এই ট্রফিটা শুধু আমার নয়; যতজন মানুষ নেপথ্যে পরিশ্রম করেছেন এবং যাঁদের ভালোবাসা ও সমর্থনে আমি এখানে আসতে পেরেছি, সবার পরিশ্রমের ভারটা ওই ট্রফির ওপর আছে। এই ট্রফির সম্মান রক্ষা করে ভবিষ্যতে এমন কাজ করতে চাই, যেন মানুষ বলতে পারে, “আমাদের মেয়েটা ভালো করছে।”
বড় পর্দায় সুযোগ। বিজয়ী হিসেবে নির্মাতা রায়হান রাফীর পরিচালনায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের ব্যানারে একটি সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ। সঙ্গে নির্মাতা শিহাব শাহীনের ওয়েব প্রজেক্টে প্রধান চরিত্র। এসব পেয়ে রোমাঞ্চিত বর্ণিতা। তিনি বলেন, যখন জানলাম যে রাফী স্যার, শিহাব শাহীন স্যার দুজনের সঙ্গেই কাজের সুযোগ পাব, তখনকার অনুভূতি প্রকাশ করার মতো নয়। ওনারা দুজনই এখন দেশসেরা। একজন নতুন শিল্পী হিসেবে আমার শুরুটা তাঁদের মতো নির্মাতাদের সঙ্গে হচ্ছে, এটা আমার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।
পাশাপাশি পড়াশোনা চলবে। এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সদ্য ভর্তি হয়েছেন, পড়ছেন পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে।
নতুনদের প্রতি বার্তা
শোবিজ বা প্রতিযোগিতায় আসতে চায় যাঁরা, তাঁদের বর্ণিতার পরামর্শ, শুধু আমাকে দেখে বা অন্য কাউকে দেখে স্বপ্ন দেখতে হবে তা না, নিজেকে দেখে নিজের জন্য স্বপ্নটা দেখতে হবে। নিজের ওপর বিশ্বাসটা দৃঢ়ভাবে রাখতে হবে, সেই চেষ্টার দ্বারাই এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।






