আন্তর্জাতিক নিলামে বাংলাদেশের শিল্পীদের চিত্রকর্মের প্রভাব ক্রমশ বাড়ছে। নিউইয়র্কে সদবি’সের আয়োজিত ‘দক্ষিণ এশীয় আধুনিক ও সমকালীন শিল্পকলা’ নিলামে এর উজ্জ্বল প্রমাণ দেখা গেছে। এখানে বাংলাদেশের ৭ জন শিল্পীর ১১টি চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়, যার মধ্যে পাঁচজনের কাজ নিলামে রেকর্ড দাম লাভ করেছে।
স্থানীয় সময় ২৬ মার্চ নিউইয়র্কে এই নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এতে ছিল রশীদ চৌধুরীর এ পর্যন্ত নিলাম হওয়া চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ট্যাপেস্ট্রি। এছাড়া শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি এবং মোহাম্মদ কিবরিয়ার ‘বালক’ শিরোনামের চিত্রকর্মও ছিল। অন্যান্য শিল্পীদের মধ্যে এস এম সুলতান, আমিনুল ইসলাম, শামসুল ইসলাম নিজামী ও শাহাবুদ্দিন আহমেদের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সদবি’সের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, নিলামে মোট ২২.১ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৭১ কোটি টাকা) মূল্যের চিত্রকর্ম বিক্রি হয়েছে। মোট ৭৩টি লট ছিল, সবগুলোই বিক্রি হয়ে যাওয়ায় এটিকে ‘হোয়াইট-গ্লাভ’ নিলাম বলে চিহ্নিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি। ৯৫ ভাগ চিত্রকর্ম আনুমানিক মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয়েছে। সদবি’সের দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলা বিভাগের ৩০ বছরের ইতিহাসে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আয়কারী নিলাম।
সদবি’সের দক্ষিণ এশীয় শিল্পকলা বিভাগের কো-ওয়ার্ল্ডওয়াইড হেড মঞ্জরী সিহারে সুতিন বলেন, “এই নিলাম দক্ষিণ এশীয় আধুনিক ও সমকালীন শিল্পকলার জন্য ছিল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। যা এই চিত্রশিল্পীদের চিত্রকর্মের বিশ্বব্যাপী সমাদার ও বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতিরই প্রমাণ। বিভিন্ন মহাদেশের অংশগ্রহণকারীদের ব্যাপক সাড়া ছিল এই আয়োজনে। এই নিলাম আন্তর্জাতিক বাজারে দক্ষিণ এশীয় শিল্পের দীর্ঘস্থায়ী গুরুত্ব এবং ক্রমবর্ধমান গতির প্রতিফলন ঘটায়।”
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের (জন্ম ১৯১৪-মৃত্যু ১৯৭৬) তিনটি চিত্রকর্ম ছিল নিলামে। এর মধ্যে ১৯৬৫ সালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিকৃতি ১৯৬৮ সালে কবি সুফিয়া কামাল ও কামালউদ্দীন আহমদ খানকে উপহার দিয়েছিলেন শিল্পী। পরে এটি তাঁদের সন্তান সাজিদ কামালের সংগ্রহে যায়। নিলামে এটি বিক্রি হয় ৮৩ হাজার ২০০ ডলারে (প্রায় এক কোটি দুই লাখ টাকা)।
১৯৬৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাজিদ কামালের সংগ্রহে ছিল জয়নুল আবেদিনের ১৯৭৪ সালে আঁকা মনপুরা পর্বের চিত্রকর্ম। সাজিদ কামাল ও রোজমেরি কামালের বিয়ের পর দেশে এসে ১৯৭৪ সালে শিল্পী এটি উপহার দেন। এটি বিক্রি হয় ৬১ হাজার ৪৪০ ডলারে (প্রায় ৭৫ লাখ টাকা)। আর ১৯৭০ সালে আঁকা মাছ নিয়ে চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৫৭ হাজার ৬০০ ডলারে (প্রায় ৭০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা)। এটি যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনার এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে, যা ২০১৯ সালে সদবি’সের অনলাইন নিলামে বিক্রি হয়েছিল।
এসব চিত্রকর্ম নিয়ে সাজিদ কামাল বলেন, ‘অনেক ভাবনাচিন্তা করে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা চেয়েছি, চিত্রকর্মগুলো নতুন কারও সংগ্রহে যাক—ভালোভাবে সংরক্ষণ হোক। অনেক বছর ধরে আমরা কাজগুলো যত্নের সঙ্গে রেখেছি।’ তিনি যোগ করেন, ‘ছোটবেলা থেকেই তাঁর সান্নিধ্য পেয়ে আমরা বড় হয়েছি। এটা আমার জীবনের মূল্যবান সঞ্চয়।’
এস এম সুলতানের (জন্ম ১৯২৩-মৃত্যু ১৯৯৪) ১৯৮৯ সালে আঁকা ‘গ্রামীণ জীবন’ চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৫১ হাজার ২০০ ডলারে (প্রায় ৬২ লাখ ৭৯ হাজার টাকা)। এটি উত্তর আমেরিকার এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে।
মোহাম্মদ কিবরিয়ার (জন্ম ১৯২৯-মৃত্যু ২০১১) ১৯৫৭ সালে আঁকা ‘বালক’ চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৫৭ হাজার ৬০০ ডলারে (প্রায় ৭০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা)। এটি ম্যাসাচুসেটসের এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে, যা ২০১৫ সালে স্কিনার নিলামে বিক্রি হয়েছিল। চিত্রশিল্পী শহিদ কবীর বলেন, ছবিটি খুবই মমতা মিশিয়ে আঁকা। সম্ভবত মধ্যবিত্ত পরিবারের শীতকালে স্কুলে যাওয়া বালকের ছবি তিনি এঁকেছেন। ছেলেটির চোখ দুটি আঁকার ধরন দেখলেই এই ছবির গভীর অনুভূতি অনুভব করা যায়। ছবিটি দেখে বোঝা যাচ্ছে না ছেলেটির হাতে ধরে থাকা গ্লাসে পানি আছে কি নেই। কিবরিয়া স্যার নিজেও একসময় ভি কলারের সোয়েটার পরতে ভালোবাসতেন। এই বালকের পরনেও রয়েছে ভি কলারের সোয়েটার। বালকের পেছনে থাকা জানালাগুলো এমন করে এঁকেছেন, তাতে কম্পোজিশনের মুনশিয়ানা আছে।
কিবরিয়ার ১৯৯১ সালে আঁকা ‘শিরোনামহীন’ চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৩২ হাজার ডলারে (প্রায় ৩৯ লাখ ২৪ হাজার টাকা), যা টেনিসির এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে। ১৯৯২ সালে সরাসরি শিল্পীর কাছ থেকে টনি কে স্টুয়ার্ট সংগ্রহ করেন এটি। আর ১৯৬৬ সালে আঁকা আরেক ‘শিরোনামহীন’ চিত্রকর্মও ৩২ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছে, মেরিল্যান্ডের এক সংগ্রাহকের কাছ থেকে।
আমিনুল ইসলামের (জন্ম ১৯৩১-মৃত্যু ২০১১) ১৯৬০ সালে আঁকা শিরোনামহীন চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৩৫ হাজার ৮৪০ ডলারে (প্রায় ৪৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা)। সদবি’সের ওয়েবসাইট অনুসারে, এটি গুরুত্বপূর্ণ এক পরিবারের সংগ্রহ থেকে এসেছে, ১৯৮০ সালে শিল্পীর কাছ থেকে সংগ্রহিত।
রশীদ চৌধুরীর (জন্ম ১৯৩২-মৃত্যু ১৯৮৬) ১৯৭৭ সালে বোনা শিরোনামহীন ট্যাপেস্ট্রি বিক্রি হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬০০ ডলারে (প্রায় ১ কোটি ৮৮ লাখ টাকা)। এটি উত্তর আমেরিকার এক খ্যাতিমান সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে।
শামসুল ইসলাম নিজামীর (জন্ম ১৯৪০-মৃত্যু ১৯৯৮) ১৯৮০ সালে আঁকা শিরোনামহীন চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ১১ হাজার ৫২০ ডলারে (প্রায় ১৪ লাখ ১৬ হাজার টাকা)। সুপরিচিত পারিবারিক সংগ্রহ থেকে এসেছে এটি, এবং ২০২৫ সালে ঢাকায় স্টুডিও সিক্সবিতে প্রদর্শিত হয়। এবারই প্রথম সদবি’সে তার চিত্রকর্ম স্থান পায়।
শাহাবুদ্দিন আহমেদের ২০১২ সালে আঁকা ‘রিফ্লেকশন’ চিত্রকর্ম বিক্রি হয় ৪৮ হাজার ৬৪০ ডলারে (প্রায় ৫৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা)। উত্তর আমেরিকার সংগ্রাহকের কাছ থেকে এসেছে, যা ২০২৪ সালে ফ্রান্সের গ্যালারি দ’আর্ত থেকে সংগ্রহিত।
নিলামে ১২ শিল্পীর চিত্রকর্ম রেকর্ড করে, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এস এম সুলতান, আমিনুল ইসলাম, রশীদ চৌধুরী, শামসুল ইসলাম নিজামী ও শাহাবুদ্দিন আহমেদ। অন্যরা বিভান সুন্দরম, কে সি এস পানিকর প্রমুখ। ভারতের মকবুল ফিদা হুসেনের ১৯৫৮ সালে আঁকা ‘সেকেন্ড অ্যাক্ট’ ৫১ লাখ ২২ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। বিশ্বের ২০টির বেশি দেশ থেকে সংগ্রাহকরা অংশ নেন।






