চার দশক অতিক্রম করেও তাঁর কণ্ঠে ক্লান্তির চিহ্ন নেই, চোখে থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং নতুন করে শুরু করার মতো উচ্ছ্বাসই লক্ষ্য করা যায়। তিনি ভারতীয় সিনেমার জনপ্রিয় অভিনেতা নাগার্জুনা আক্কিনেনি। এই দক্ষিণি তারকা এখন তাঁর ক্যারিয়ারের শততম চলচ্চিত্রের সামনে দাঁড়িয়েছেন।
শুরুর সেই মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ছবি
১৯৮০–এর দশকের শেষভাগে মণি রত্নমের ‘গীতাঞ্জলি’ তাঁর অভিনয়জীবনের পথ বদলে দেয়। তার আগে তেলেগু ছবিতে কয়েকটি সফলতা পেলেও ‘গীতাঞ্জলি’ই তাঁকে সত্যিকারের পরিচয় এনে দেয়। পরবর্তীতে রামগোপাল ভার্মার ‘শিবা’ সেই অবস্থানকে আরও মজবুত করে।
নাগার্জুন নিজেই বলেন, ওই সময় দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমায় নতুন কিছুর খোঁজে ছিল তরুণ প্রজন্ম। আর সেই পরিবর্তনের ঢেউয়ে তিনি ছিলেন ‘সৌভাগ্যবান প্রথম সারির’ একজন।
পারিবারিক উত্তরাধিকার কিন্তু নিজস্ব সংগ্রাম
তিনি কিংবদন্তি অভিনেতা আক্কিনেনি নাগেশ্বর রাওয়ের সন্তান। কিন্তু উত্তরাধিকারকে তিনি কখনো সহজলভ্য মনে করেন না। তাঁর ভাষায়, ‘উত্তরাধিকার কাউকে দেওয়া যায় না, সেটা অর্জন করতে হয়।’
একই কথা তিনি নিজের সন্তানদের ক্ষেত্রেও বিশ্বাস করেন—নাগা চৈতন্য ও অখিল আক্কিনেনি—তাঁদেরও নিজেদের পথ নিজেরাই গড়তে হবে।
জীবন বদলে দেওয়া ছবিগুলো
নাগার্জুনার ক্যারিয়ারে কয়েকটি ছবি শুধু সফলই নয়, ব্যক্তিগতভাবেও গভীর ছাপ ফেলেছে। যেমন ‘অন্নমায়া’ ও ‘শ্রী রামাদাসু’। এই ভক্তিমূলক চলচ্চিত্রগুলো তাঁর মনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এনেছে।
নাগার্জুনা বলেন, ‘অন্নমায়া’ করার সময় পুরো ইউনিট যেন শুধু একটি ছবির জন্য নয়, ভক্তির জায়গা থেকে কাজ করছিল। সেই অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ছিল একধরনের আত্মিক জাগরণ।
সিনেমা, সংস্কৃতি ও দর্শকের বন্ধন
বহু ভাষার সিনেমায় কাজ করে তাঁর একটি উপলব্ধি—দর্শক সবসময় নিজের সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে যুক্ত গল্পই বেশি পছন্দ করেন। বিদেশি লোকেশন বা পাশ্চাত্য ধাঁচ সাময়িক আকর্ষণ তৈরি করলেও স্থায়ী প্রভাব ফেলে না।
দক্ষিণের তারকাপূজার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দর্শকের আবেগ এখানে অনেক গভীর। তাঁরা তারকাদের সঙ্গে একধরনের ব্যক্তিগত সম্পর্ক অনুভব করেন।
নতুন যুগের প্রযুক্তি
সাম্প্রতিক তেলেগু সিনেমার বিশ্বব্যাপী সাফল্য—যেমন ‘আরআরআর’, ‘বাহুবলী’ বা ‘পুষ্পা’—নিয়ে তাঁর ব্যাখ্যা আলাদা। তাঁর মতে, এই গল্প বলার ধরন আগে থেকেই ছিল। নতুন যোগ হয়েছে প্রযুক্তির শক্তি, যা সেই স্বপ্নগুলোকে বড় আকারে তুলে ধরছে।
নতুন চরিত্রে নতুন পরীক্ষা
এই পর্যায়ে তিনি নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পেতে চান। ‘কুবেরা’-তে এক সাবেক সিবিআই কর্মকর্তার ভূমিকায় অভিনয় করছেন, যেখানে দারিদ্র্য ও বিপুল সম্পদের দ্বন্দ্ব ফুটে উঠবে।
এছাড়া ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ সিনেমায় ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে কাজ করেছেন। তাঁর মতে, এখন তিনি শুধু নায়ক নন—ভিন্নধর্মী চরিত্রেও কাজ করতে আগ্রহী।
শততম ছবির চমক
নাগার্জুনার শততম ছবির কাজ ইতিমধ্যে প্রায় ৪৫ শতাংশ সম্পন্ন। আপাতত ছবিটির নাম ‘কিং ১০০’। পরিচালক রা কার্থিক। এটি একটি বাণিজ্যিক গল্প, যেখানে বাবা-মেয়ের সম্পর্ক এবং দারিদ্র্য থেকে উত্থানের কাহিনি থাকবে।
এই ছবিতে ডি-এজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাঁকে ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সের বিভিন্ন পর্যায়ে দেখানো হবে। অভিনয়ে আছেন টাবুসহ আরও অনেকে।
তবে গল্পের বিস্তারিত এখনই প্রকাশ করতে চান না তিনি। বড় আকারে উন্মোচনের পরিকল্পনা রয়েছে।
থামার কোনো ইচ্ছা নেই
অনেকে যেখানে ক্যারিয়ারের ‘পরবর্তী অধ্যায়’ নিয়ে ভাবেন, সেখানে নাগার্জুনার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। তাঁর স্পষ্ট কথা—‘কোনো নতুন অধ্যায় নয়। আমি কখনো এভাবে ভাবিনি।’
চার দশক পেরিয়েও তাঁর এই অদম্য মানসিকতাই যেন বলে দেয়—নাগার্জুনার জন্য সিনেমা এখনো শুধু পেশা নয়, এক অন্তহীন যাত্রা।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে






