৪ এপ্রিল ১৯৩৩। ১১৩ সেগুন বাগান, ঢাকা। সাজেদা খাতুনের কোলে তাঁর সপ্তম সন্তান কালো হয়ে এল। কেলেকোলো হলেও কী হয়েছে! মাছের মতো বড় বড় চোখে ট্যাকট্যাক করে চেয়ে নাম পেল মীনাক্ষী। কাটছাঁটে বড়দের কাছে মিনা, ছোটদের কাছে মিনু। পোশাকি ডাকে সন্জীদা খাতুন। ঋতুরাজ বসন্তের আনন্দপ্রতিচ্ছবি। সেই আনন্দকালে ফুটে পূর্ণতায় পৌঁছে, বিরানব্বই বসন্ত পেরিয়ে ঝরে পড়লেন। শেষ মুহূর্তেও মনপ্রাণ সঁপে গাইলেন, ‘ঝরা পাতা গো, আমি তোমারি দলে।’ এই চরাচরে সেই কালো মেয়ে দীর্ঘ নয় দশকের জীবনে স্নিগ্ধ বাসন্তী আলো ছড়িয়ে গেছেন। শত্রু-মিত্র সকলের অন্তরে প্রবল আলোড়ন তুলেছেন। শুভ জন্মদিন, আলোর পথিক!
আবির্ভাবের দিনেই তাঁর তিরোভাব মনে পড়ে। কারও মনে শান্ত ছায়া পড়বে, কারও মনে বিষাক্ত হুল ফুটবে। কারণ দেশ তখন অস্থির-উন্মাদ। এক বিস্ফোরণে সরকার পতন। দেশ অন্তর্বর্তী উপদেষ্টাদের হাতে। সংস্কারের নামে বাংলার গলায় ফাঁস। পাকিস্তানি শাসনামলের বিরোধিতার সব ঐতিহ্য উপড়ে ফেলা, গুঁড়িয়ে দেওয়া। নির্বিচারে বিপক্ষবাদীদের কারাগারে। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, একাত্তর ভোলানোর উৎসব! বাকস্বাধীনতা চরমে, তবে শুধু এক গোষ্ঠীর সম্পদ। যুক্তবাদী মন কথা বললেই ‘মব’। উগ্র-দমন। সেই সন্ত্রাস প্রচণ্ড, হিংস্র, অমানবিক! রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নেই, নাকি অরাজকতা আরাধ্য? সদা উত্তর মেলে না। শান্তিপ্রিয় জনতা নিজে বাঁচতে ত্রস্ত। পঞ্চাশোত্তীর্ণ বাংলা চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে।
সৌভাগ্য, সন্জীদার তেজোদীপ্ত চেতনায় তখন ক্রমান্বয় ক্ষয়। স্বজনরা হতভম্ব, সন্ত্রস্ত। গুটিকয় প্রকাশ্য রক্তচক্ষুতে বাঙালির স্বাধীন দেশ কি পিছু হটছে! উগ্রবাদী পরাধীনতার আগল আবার মুক্ত। সেই শঙ্কা বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংগ্রামীকে?
চব্বিশ নভেম্বর। সন্জীদা আরও ম্রিয়মাণ। কথা কম। প্রিয় গান একঘেয়ে। কেউ কিছু পড়ে শোনাবে? মন ভরে না। নড়াচড়া বিছানায় এ-কাত ও-কাত। দু হাজার সতেরোর বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপনী কথায় বলেছিলেন, “ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাংলা সংস্কৃতির ভালো নিদর্শনগুলো ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন।”
ডায়ালাইসিসের আগ্রাসন। হুইলচেয়ারে সপ্তাহে দুদিন হাসপাতাল। নিস্তার নেই। অল্পদিন টানা হাসপাতালে। একদিন ডাক্তার বললেন, লাইফ সাপোর্ট নেবেন কি না জেনে রাখতে। অশনিসংকেত! ইংল্যান্ড যাওয়া বাতিল, আমেরিকা থেকে কাঁদতে কাঁদতে এল নাতনি প্রকৃতি।
দু হাজার পঁচিশের মার্চ শুরুতে আবার হাসপাতাল। এইচডিইউ। সাউথ আফ্রিকা ট্যুর নাকচ রুচিরা। শরীর কিছুটা স্বাভাবিক। কেবিন মিলল। দশেক দিন। অনুজ সারওয়ার-রত্না দেখে গেলেন। ডাক্তারদের মুখে স্বস্তি নেই, দুশ্চিন্তা। ঘণ্টা বাজছে! সারওয়ার ভাইয়ের দ্বিধা, মিসর ভ্রমণ বাদ? আলবত জানেন, অগ্রজ চলে গেলে ছায়ানটের ঝড় তাঁকেই সামলাতে হবে। পরিবারের শঙ্কা ঘন।
পাছে নতুন রোগ বাধে, ডাক্তাররা অস্থির। মেরামত অসম্পূর্ণ তবু ছুটি। প্রায় বাকরহিত সন্জীদাও মুক্তি চান। মার্চ ১৮-এর সন্ধ্যায় বাড়ি। মুখে স্মিত হাসি! এক ঘণ্টায় বাকরহিত। দম আছে সাড়া নেই। খাওয়া বন্ধ। সকালে হাসপাতাল, আইসিইউ। জানা গেল ব্রেনে একাধিক ছোট স্ট্রোক।
পাঁচ দিন। জ্ঞান ফিরল না সদা-কর্মচঞ্চল মানুষটির। কালরাত ৩টায় হাসপাতাল থেকে তাড়া, অবনতি হচ্ছে। কেউ পৌঁছানোর আগে অগোচরে ছুটি নিলেন সন্জীদা। এক মানবিক কর্মমুখর জীবনের অবসান। ছুটে এল স্বজন-সহযাত্রী-সাংবাদিক। ছায়ানটকর্মীরা জিজ্ঞাসা, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠান স্থগিত? সন্তানদের দৃঢ় উত্তর, ‘আমাদের কাছে উনি অনেক বড়, কিন্তু দেশ তারও অনেক ওপরে।’ পাল্টা প্রশ্ন, ‘উনি নিজে কি কখনো দেশের জন্য দায়িত্ব থেকে সরেছেন?’ সবাই নীরব।
গণমাধ্যমের জিজ্ঞাসা, কবে কখন কোথায় জানাজা, দাফন। নিকটজন জানে সন্জীদার ইচ্ছা—গান আর দেহদান। পরিস্থিতি গনগনে। বলা হলো, ‘বিদেশ থেকে নাতি-নাতনি ফিরলে সিদ্ধান্ত।’ সন্জীদা দূরদর্শী, সব গুছিয়ে রেখেছেন। শেষ গা ধোয়াবে নাতনি অনি ও তিন্নি। তিন্নি লন্ডনে। তাই আপাতত স্বাধীনতা দিবসের পর ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
মানুষের অভূতপূর্ব জোয়ার। ভবন ছাড়িয়ে ধানমন্ডি ২৭ নং সড়ক খেয়ে নিল লাইন। ভেতরে সন্জীদার প্রিয় গানের স্রোত। সবাই মনপ্রাণ ঢেলে গাইছে। তাঁর আগে সহযোদ্ধাদের বিদায়ে তিনিও উজাড় করে গাইতেন।
অপরাজেয় বাংলা চত্বরে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ ছুঁয়ে জাতীয় শহীদ মিনারে। পরিবারের স্বস্তি। যাঁর জীবনের ভিত বাংলা ভাষা, দেশজাগরণ ভাষা আন্দোলনে, বিশ্বাস-অনুভূতি বাংলা-সাহিত্য-সংগীতে; দেশ-মানবতা-সংস্কৃতির অকুতোভয় যোদ্ধা শেষবার ভাষার সূত্রে স্বদেশ আন্দোলনের বীজবপনকারীদের স্মৃতিমহলে।
হিমঘরে এক রাত। সকালে দেহদান। চিরসাথি সুর, ফুল, আটপৌরে শাড়ি, লাল টিপ। সন্জীদার ইচ্ছাপূরণ। পরিবার সগৌরবে জানায়। মানুষের প্রতি ভালোবাসায় মানুষের সান্নিধ্যে কায়া বিলি। পূর্ণ আত্মনিবেদন।
সময়টা উগ্রবাদীদের বচন-কাজ সন্জীদাদের মননের বিপরীত। অসুস্থ মানসিকতা আগুনে। সংস্কৃতিপ্রতিষ্ঠান-গণমাধ্যম ছাড় পায় না। ক্ষতি সাময়িক। গড়ার কারিগররা হতোদ্যম নয়। হামলাকারীদের লাভ? তাদের ভাঙচুরে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও পরিচিত হয়েছে। জনপ্রিয়তার উন্নতি।
ঠিক ছায়ানট বর্ষবরণ বোমা হামলায়। দশ তাজা প্রাণ ঝরে। ভয় নয়, দোষারোপ নয়। সন্জীদা মঞ্চে আসীন। দেশবাসী জানল ছায়ানটের আয়োজন, সংস্কৃতির শক্তি।
প্রয়াণেও একই। ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।’ বাকস্বাধীনতার ধুয়ায় অশ্লীলতা-কটুক্তি। কিন্তু ভক্তরা নির্ভীক গানে বিদায়সভা। স্বজনরা মানবকল্যাণে শায়িত। তিনি সব মহলকে আন্দোলিত করেছেন।
শেষ দেখায় জন্মদিনের কালো বরণ। ট্যাকট্যাক চোখ নিমিলিত। আটপৌরে শাড়ি, লাল টিপ সতেজ। বাঙালির ঘরে এমন স্বাধীনচেতা দেশপ্রেমিকের জন্ম হোক! প্রতিদিন শুভ জন্মদিন বলতে পারি!
● পার্থ তানভীর নভেদ্: সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী, সন্জীদা খাতুনের সন্তান






