চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার পোমরা ইউনিয়নের কৃষক মো. আজগর এবার বোরো মৌসুমে তিন একর জমিতে ধান চাষ করেছেন। গত এক সপ্তাহে ডিজেল কিনতে কয়েকবার বাজারে গিয়েছেন। কিন্তু মাত্র একবার পেয়েছেন, ১০ লিটার চেয়ে ৪ লিটার। দামও লিটারে ২০ টাকা বেশি।
গত বুধবার মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে আজগর বলেন, “ডিজেলের দোকানগুলো বন্ধই থাকে। মাঝেমধ্যে খোলা পেলেও প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল পাওয়া যায় না।”
পোমরার পাশের সরফভাটা ইউনিয়নের পশ্চিম সরফভাটা গ্রামের কৃষক মো. আলমগীরও একই অভিযোগ করেছেন। মুক্তকণ্ঠকে তিনি বলেন, ধানের শিষ বের হচ্ছে। এ সময় সেচ না দিলে ফসলের ক্ষতি হবে। তিনি প্রতিদিন ডিজেল কিনতে যান, কিন্তু প্রয়োজনমতো পান না।
আজগর ও আলমগীরের মতো দেশের অনেক কৃষক এখন বিপাকে পড়েছেন। চট্টগ্রাম, জামালপুর, পটুয়াখালী, রাজশাহী, গাজীপুর, বরগুনা, সিলেট, ফরিদপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারীসহ ১২টি জেলার ১৫ জন কৃষকের কাছে গত বুধ ও বৃহস্পতিবার ডিজেলের বিষয়ে জানা হয়েছে। তাঁরা সবাই প্রয়োজন অনুযায়ী না পাওয়ার কথা বলেছেন। কেউ কেউ সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে কিনতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন। বিভিন্ন জেলা থেকে মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের প্রতিবেদনেও সরবরাহে ঘাটতির তথ্য পাওয়া গেছে।
সেচযন্ত্রের বড় অংশ চলে ডিজেলে, বাকিটা বিদ্যুতে। ধান, গম ও ভুট্টা সংগ্রহ, মাড়াইয়ের জন্যও কৃষিযন্ত্র লাগে, যা মূলত ডিজেল বা পেট্রল চালিত। কৃষিযন্ত্র পরিচালকরা প্রয়োজনমতো জ্বালানি পাচ্ছেন না।
কৃষক ও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ডিজেলের অভাবে সেচে সংকট তৈরি হয়েছে। ফসল কাটাতেও বিপদ। বোরো ধান কাটা কিছুদিন পর শুরু হবে। তখন ডিজেল না পেলে সমস্যা বাড়বে। বিশেষ করে হাওরে দ্রুত কাটা জরুরি, যাতে আগাম পানিতে ফসল না নষ্ট হয়।
রাঙ্গুনিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল হাসান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কৃষক আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার। পাম্পে ও দোকানে বলা আছে, কৃষককে সবার আগে ডিজেল দিতে হবে।” অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
কত যন্ত্র, কত চাহিদা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) জানায়, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত কৃষি সেচ মৌসুম। দেশে ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি। এর মধ্যে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি (পাম্প), পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন্ড হারভেস্টর, ফসল মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্রসহ অন্যান্য রয়েছে।
ডিএইর হিসাবে, কম্বাইন্ড হারভেস্টার ১০ হাজার ৭২৬টি, যা ফসল কেটে মাড়াই করে বস্তায় ভরে। ফসল মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র ৪ লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।
ডিএই অনুসারে, এই সেচ মৌসুমে সেচ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা সাড়ে ১২ লাখ টন। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বৃষ্টির কারণে সেচের চাহিদা কিছুটা কমেছে। দুই সপ্তাহে বিভিন্ন জেলায় বৃষ্টি হয়েছে, যাতে আলু, তরমুজসহ কিছু ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বলছে, ছয় মাসের সেচ মৌসুমে শুধু সেচযন্ত্রে জ্বালানির চাহিদা প্রায় ৭ লাখ ৬০ হাজার টন।
কৃষকেরা স্থানীয় বাজারের বিক্রেতাদের কাছ থেকে তেল নেন। এদের সাধারণত লাইসেন্স নেই। দেশজুড়ে অভিযানে মজুত তেল ধরা পড়ছে, জরিমানার ভয়ে অনেকে বিক্রি বন্ধ রেখেছেন। ফলে সরবরাহে অভাব, কৃষিতে প্রভাব পড়ছে।
ডিজেলের মজুত কত
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ইরান পাল্টা আঘাত করছে। তারা হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করেছে। বিভিন্ন দেশের জ্বালানি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। ফলে সরবরাহ বিঘ্নিত ও দাম বেড়েছে।
বাংলাদেশেও ক্রেতারা আতঙ্কিত হয়ে জ্বালানি কিনছেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) গত বছরের সমান সরবরাহ করছে, কিন্তু চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। ফিলিং স্টেশনে ভিড়, অনেকটা সময় বন্ধ থাকে। মজুতদারির ঘটনাও ঘটছে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের গত বৃহস্পতিবারের তথ্যে, ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা ৪৫ লাখ মেট্রিক টন। মজুত ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন। দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টন, পাওয়া যাচ্ছে সাড়ে ১১ হাজার টন।
কৃষি সেচ মৌসুমে প্রতি মাসে গড়ে ২ লাখ ৯ হাজার টন ডিজেল চাই। দৈনিক ৭ হাজার টন (বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল)।
বরগুনার সদর উপজেলার কেউরবুনিয়া ইউনিয়নের মো. মামুন বলেন, তাঁর পাওয়ার টিলার নিয়মিত চালাতে পারেন না। “দোকানে মাঝেমধ্যে পাই, কিন্তু ১২০ থেকে ১৩০ টাকা দিয়ে কিনতে হয়েছে।” নির্ধারিত দর ১০০ টাকা।
ধান কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তা
ধান-গম কাটা ও মাড়াইয়ে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টরের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। সরকার হাওরে ৭০ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ ভর্তুকি দিয়েছে।
কৃষি যন্ত্রপাতি কোম্পানিগুলো বলছে, আবাদ জমির ১৫ শতাংশ ধান হার্ভেস্টর দিয়ে কাটা হয়, যা ডিজেল চালিত। রিপার পেট্রল চালিত, থ্রেশার ডিজেল চালিত।
এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, হার্ভেস্টার ও ট্রাক্টরকে অগ্রাধিকার দিয়ে আইডি ভিত্তিক সরবরাহ করা যায়। “একটি হার্ভেস্টারের দৈনিক ৬০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল লাগে। সে অনুযায়ী বরাদ্দ দিলে সমস্যা হবে না।”
জ্বালানিসংকটের কারণে কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। এটা খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান
বোরো প্রধান মৌসুম
বোরো দেশের প্রধান ধান মৌসুম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৪ কোটি ৯ লাখ টন চাল উৎপাদিত, যার ৫২ শতাংশ বোরো।
বোরোর বড় অংশ হাওর থেকে। ২০১৭ সালে আগাম বৃষ্টি-বন্যায় আট লাখ টন চাল কম উৎপন্ন হয়, চালের দাম বেড়ে যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত কাটা নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান বলেন, “জ্বালানিসংকটের কারণে কৃষি যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি। এটা খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়।” কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, বিকল্প আমদানি ও ভর্তুকি দিয়ে সহায়তা করতে হবে বলেছেন তিনি।






