কক্সবাজারের রামুর উত্তর মিঠাছড়ির পাহাড়চূড়ায় অবস্থিত বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রে প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৬০০ পর্যটক এসে দেশের সর্ববৃহৎ ১০০ ফুট লম্বা সিংহশয্যা বুদ্ধমূর্তি দেখছেন। একসময় আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া এই বৌদ্ধবিহার এখন পর্যটকদের জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। অনেকে পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে এখানে আসছেন।

পাহাড়ের গা বেয়ে ৮৮ ধাপের প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ পাকা সিঁড়ি উঠে গেছে। সিঁড়ি বেয়ে ওঠার সময় দুপাশে সারিবদ্ধ বুদ্ধমূর্তিগুলো চোখে পড়ে। উত্তর পাশে ২১টি ৭ ফুট উঁচু দাঁড়ানো মূর্তি এবং দক্ষিণে ১৮টি ৪ ফুট উঁচু বসা মূর্তি নতুন করে স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি এই ৩৯টি মূর্তি যুক্ত হওয়ায় দর্শনার্থীদের সংখ্যা আরও বেড়েছে। মিয়ানমারের কারিগররা তিন বছরে এগুলো তৈরি করেছেন, খরচ হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।

শেষ ধাপে পৌঁছে সামনে উঁঠে ওঠে বিশাল সিংহশয্যা গৌতম বুদ্ধমূর্তি। এর দৈর্ঘ্য ১০০ ফুট, উচ্চতা ৫০ ফুট এবং প্রস্থ ২২ ফুট। মাথা দক্ষিণে ও পা উত্তরে রেখে ২০০৬ সালে মিয়ানমারের কারিগর আনিয়ে নির্মাণ শুরু হয়। ব্যক্তিগত অর্থ থেকে শুরু হলেও ভক্তদের অনুদান ও বিদেশী সহায়তায় কাজ এগোয়। ২০১২ সালের আগস্টে মূল কাঠামো সম্পন্ন হয়।

‘রাত প্রায় দুইটার দিকে হঠাৎ হামলা শুরু হয়। আমরা কেউ ভাবতেই পারিনি, এমন কিছু ঘটবে। প্রাণভয়ে জঙ্গলে পালিয়ে যাই। মনে হয়েছিল যে সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। সকালে এসে দেখি, বিহার পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু বুদ্ধমূর্তিটি টিকে আছে।’
—করুণাশ্রী মহাথের, প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র

মূর্তির উদ্বোধনের আগেই ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে কয়েক শত দুর্বৃত্ত লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। অগ্নিসংযোগে বিহার পুড়ে যায়, মূর্তির ভিতরে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। পরে সরকার ও সেনাবাহিনীর সাহায্যে পুনর্নির্মাণ হয়। মূর্তিটি সংস্কার করে সোনালি রঙে সাজানো হয়।

কুমিল্লার ব্যবসায়ী নাজমুল হুদা বলেন, ‘কক্সবাজারে ঘুরতে এসে এই বুদ্ধমূর্তির কথা জানতে পারি। এত বড় বুদ্ধমূর্তি দেশে আগে কোথাও দেখিনি।’

ঢাকার শ্যামলীর স্কুলশিক্ষক রুপালী চাকমা বলেন, ‘খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, রাঙামাটিতে অনেকবার গিয়েছি। কিন্তু এমন বিশাল ও ভিন্নধর্মী বুদ্ধমূর্তি আগে কোথাও চোখে পড়েনি। গৌতম বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এখানে আসা।’

প্রতিষ্ঠাতা করুণাশ্রী মহাথের বলেন, ‘সিংহশয্যা’ নামটির একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। সিংহ ডান কাতে শুয়ে সতর্ক অবস্থায় ঘুমায়। গৌতম বুদ্ধও ধ্যানমগ্ন অবস্থায় ডান পাশে শুয়ে, ডান হাতের ওপর মাথা রেখে বিশ্রাম নিতেন। সেই ভঙ্গিমা অনুসরণ করেই মূর্তিটির নামকরণ করা হয়েছে ‘সিংহশয্যা’। তিনি বলেন, বুদ্ধত্ব লাভের আগে দীর্ঘ সময় ধরে বুদ্ধ এভাবেই ধ্যানচর্চা করতেন। সে চিত্রই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

বিহার এলাকায় প্রায় দুই একর জায়গায় নতুন উন্নয়ন প্রকল্প চলছে। এর আওতায় এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ২০০ ফুট দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু তৈরি হচ্ছে। সেতুর শেষে ১২০ ফুট উঁচু স্বর্ণজাদি গড়ে উঠবে। প্রকল্পের খরচ ধরা হয়েছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে পাইলিং কাজ শুরু হয়েছে, অনুদানে ধাপে ধাপে এগোচ্ছে।

করুণাশ্রী মহাথের বলেন, ‘আমার স্বপ্ন ছিল এমন একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করা, যা বাংলাদেশে অনন্য হবে। কক্সবাজারে প্রতিবছর লাখো পর্যটক আসেন। তাঁদের সামনে বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্য তুলে ধরা এবং পর্যটনকে আরও সমৃদ্ধ করাই ছিল মূল লক্ষ্য। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ধর্মীয় উপাসনার পাশাপাশি এই স্থান দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে বলে আশা করছি।’