বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে দেশের জ্বালানি খাতে সরবরাহের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে এবং ভর্তুকির চাপ বেড়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় করণীয় নিয়ে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতামত।

সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়, ভর্তুকির চাপ এবং জ্বালানির দাম বাড়ানো—এসব বিষয় এখন ব্যাপক আলোচনায়। কিন্তু এই আলোচনায় একটি মূল বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত হয়ে যায়। সব বাড়তি খরচই লোকসান বা ভর্তুকি নয়, অনেক ক্ষেত্রে এগুলো পূর্ববর্তী মুনাফা বা কাঠামোগত ত্রুটির ফলাফল, যা সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।

প্রথমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কথা বলা যাক। সাম্প্রতিক সময়ে যে অতিরিক্ত অর্থের কথা উঠছে, তাকে অনেকে লোকসান বা ভর্তুকি বলে দেখছেন। কিন্তু বাস্তবে তা পুরোপুরি সঠিক নয়। বিপিসি গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ৪ হাজার ৩০০ কোটি টাকা মুনাফা অর্জন করেছে। তাই বর্তমান ঘাটতি বিপিসির জন্য নতুন কোনো বোঝা নয়। প্রতিষ্ঠানের অতীত মুনাফা থেকেই এই খরচ বহন করা সম্ভব। এটি বিপিসির উপার্জিত অর্থ, যা মূলত ভোক্তাদের কাছ থেকে আগে আদায় করা হয়েছে। জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ কাঠামোর ত্রুটির কারণে ভোক্তারা ১৫ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়েছে, যা বিপিসির মুনাফা বাড়িয়েছে।

আরপিজিসিএলসহ (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড) অন্যান্য জ্বালানি প্রতিষ্ঠানেও একই রকম চিত্র। তাদের মুনাফা কম হলেও তারা সম্পূর্ণ লোকসানে নেই। ফলে জ্বালানি খাতের সব খরচকে সরাসরি ভর্তুকি বলে দেখা বাস্তবসম্মত নয়।

বিদ্যুৎ খাতে পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। এখানে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকির প্রয়োজন। কিন্তু এই সংকট নতুন নয়, এটি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। গত কয়েক বছর ধরে বিদ্যুৎ খাত লোকসানে চলছে। ক্যাপাসিটি চার্জ, দামি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি এবং অনিয়ন্ত্রিত খরচের কারণে আর্থিক চাপ বেড়েছে। তবে ভর্তুকি কমানোর অর্থ জ্বালানির দাম বাড়ানো নয়। বরং মূল্য নির্ধারণ কাঠামো সংশোধন করে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো দরকার। সঠিক মূল্য নির্ধারণে ভোক্তার ওপর চাপ না দিয়েই অর্থ সাশ্রয় সম্ভব।

ডলার সংকট আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জ্বালানির দাম বাড়িয়ে ভোক্তার কাছ থেকে বেশি টাকা নিলেও তা আমদানি বাড়াবে না, কারণ ভোক্তা টাকা দেন, ডলার নয়। জ্বালানি আমদানির জন্য ডলার লাগে। এখানে সরকারের প্রধান কাজ দীর্ঘমেয়াদি বিকল্প তৈরি। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি সেচে ডিজেল কমিয়ে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ চালু করলে বছরে প্রচুর ডলার বাঁচবে। পরিবহনে বৈদ্যুতিক যানবাহন বাড়ালে জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা কমবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র দ্রুত অনুসন্ধান ও উৎপাদনে আনলে এলএনজির চাপ কমবে এবং মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

বর্তমান সংকট বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের অংশ। এর প্রভাব পড়ছে শিল্প, কৃষি, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে। সরকারের উচিত স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করা। জ্বালানি খাতের সংকটকে শুধু ভর্তুকি বা দামবৃদ্ধির প্রশ্ন মনে করলে চলবে না। সঠিক মূল্য নির্ধারণ, অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে এটি মোকাবিলা সম্ভব।

  • খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম: গবেষণা পরিচালক, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)