টেলিভিশনের পর্দায় হাসি আর রসিকতার প্রতীক কপিল শর্মা। মানুষকে হাসানোর পেশা থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের একটা আলাদা সাম্রাজ্য। কিন্তু এই অবস্থায় পৌঁছাতে তাঁর পথ ছিল একেবারে সহজ নয়। মাত্র ৫০০ টাকা আয় দিয়ে যাত্রা শুরু করা এই কমেডিয়ান এখন প্রায় ৪০০ কোটি টাকার সম্পদের মালিক। ভারতীয় ছোট পর্দার তারকাদের মধ্যে উপার্জনের দিক থেকে তিনি সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। আজ তাঁর জন্মদিন।

কপিল শর্মা ১৯৮১ সালের ২ এপ্রিল ভারতের অমৃতসরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা ছিলেন পুলিশ কনস্টেবল, মা গৃহিণী। সীমিত আয়ের পরিবারে বেড়ে ওঠা কপিল ছোটবেলা থেকেই গান, অভিনয় এবং মঞ্চের প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। পরিবারও তাঁর এই আগ্রহকে উৎসাহিত করেছে।

ক্যারিয়ারের শুরুতে তাঁকে একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। ২০০১ সালে ‘গদর: এক প্রেম কথা’ ছবির শুটিংয়ে অমৃতসরে সেটে গিয়ে একটা ছোট দৃশ্যে অভিনয়ের সুযোগ পান। কিন্তু নির্দেশনা ঠিকমতো না মানায় অ্যাকশন পরিচালক তিনু বর্মার বকুনি খেয়েই চড় খেয়ে সেট থেকে বিতাড়িত হন। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে কপিল বলেছেন, ঘটনাটি তাঁকে নিজের দক্ষতা প্রমাণের জন্য আরও দৃঢ় করেছে।

প্রতিযোগিতার মাধ্যমে টিভির শীর্ষে
২০০৭ সালে তাঁর জীবনে আসে বড় মোড়। ‘দ্য গ্রেট ইন্ডিয়ান লাফটার চ্যালেঞ্জ’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিজয়ী হন এবং ১০ লাখ টাকা পুরস্কার পান। এটাই তাঁর প্রথম বড় সাফল্য এবং জাতীয় পরিচিতি। এরপর ‘কমেডি সার্কাস’-এ একাধিকবার জয়ী হয়ে তিনি নিজেকে দক্ষ কমেডিয়ান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তাৎক্ষণিক সংলাপ এবং সাধারণ বিষয়কে হাস্যরসে রূপান্তরের দক্ষতা তাঁকে দর্শকের কাছে জনপ্রিয় করে।

২০১৩ সালে শুরু হয় তাঁর নিজস্ব শো ‘কমেডি নাইটস উইথ কপিল’। পরিবারকেন্দ্রিক হাস্যরস, সামাজিক ব্যঙ্গ এবং অতিথিদের সঙ্গে স্বাভাবিক কথোপকথনের সমন্বয়ে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়। ২০১৬ সালে আসে ‘দ্য কপিল শর্মা শো’, যা এখনো টেলিভিশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় অনুষ্ঠানগুলোর একটি। বলিউড তারকাদের সঙ্গে তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত আড্ডা এবং রসিকতা এর মূল আকর্ষণ। তিনি শোটি সঞ্চালনার পাশাপাশি সহপ্রযোজকও। প্রতি পর্ব থেকে বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ কোটি টাকা আয় করে তিনি ছোট পর্দার সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিকপ্রাপ্ত তারকাদের একজন।

বিতর্ক, বিরতি ও নতুন করে উত্থান
সাফল্য সবসময় অবাধ নয়। ক্যারিয়ারের চূড়ায় কপিলকে বড় সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। সহশিল্পী সুনীল গ্রোভার ও আলী আসগরের সঙ্গে বিরোধ, শোর জনপ্রিয়তা হ্রাস এবং ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে সমালোচনায় তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শুটিং সেটে অসুস্থতার ঘটনাও তাঁর মানসিক চাপের ইঙ্গিত দেয়। একসময় শোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।

কঠিন সময় থেকে তিনি ঘুরে দাঁড়ান। কিছুটা বিরতি নিয়ে নিজেকে সামলে ফিরে আসেন। নতুন করে শুরু ‘দ্য কপিল শর্মা শো’ আবার দর্শকদের হৃদয় জয় করে। অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও পরিণতভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন।

টিভির বাইরে বড় পর্দায়ও তাঁর অবদান রয়েছে। ২০১৫ সালে ‘কিস কিস কো প্যার করু’ দিয়ে বলিউডে অভিষেক। এরপর ‘ফিরঙ্গি’, ‘জুইগ্যাটো’ এবং সাম্প্রতিক ‘ক্রু’ ছবিতে অভিনয় করেন। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ‘দ্য অ্যাংরি বার্ডস মুভি টু’-তে এক চরিত্রে কণ্ঠ দেন।

অর্থনৈতিকভাবে তিনি শীর্ষে। মোট সম্পদ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। মুম্বাইয়ের অন্ধেরিতে ৩০ কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। আয়করে প্রায় ৩০ কোটি টাকা দিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্র জানায়। হাসির মাধ্যমে দর্শককে আনন্দ দেওয়া কপিল এখনো বিনোদনজগতের গুরুত্বপূর্ণ চেহারা। জন্মদিনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ভক্তরা পুরোনো ছবি-ভিডিও শেয়ার করে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন, সহশিল্পীরাও ভালোবাসা ও শুভকামনা পাঠাচ্ছেন।