পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনায় ১২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এ ঘটনায় চার গেটম্যান ও বাসচালককে সরাসরি এবং রেলের একজন প্রকৌশলীকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে। তদন্তে জানা গেছে, দুর্ঘটনার আগে গেটম্যানরা টাকার বিনিময়ে নিজেদের মধ্যে দায়িত্ব বদল করেছিলেন।
কুমিল্লার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনার সময় দায়িত্ব পালনের কথা ছিল রেলওয়ের দুই গেটম্যান মো. মেহেদী হাসান ও মো. হেলাল উদ্দিনের। কিন্তু তারা কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে টাকার বিনিময়ে নাজমুল হোসেন ও কাউসার হোসেন নামের অন্য দুই গেটম্যানের সঙ্গে দায়িত্ব বদল করেন। এরপর মেহেদী ও হেলাল বাড়ি চলে যান। দায়িত্ব বদলের বিনিময়ে টাকা নেওয়া নাজমুল ও কাউসার সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ট্রেন আসার সময় গেট ব্যারিয়ার না ফেলায় রেলপথে যাত্রীবাহী বাস চলে আসে এবং ট্রেনের সঙ্গে সংঘর্ষে ১২ জন যাত্রী প্রাণ হারান। তাঁদের মধ্যে ৩টি শিশু ছিল।
গত ২১ মার্চ দিবাগত রাত ২টা ৫৫ মিনিটে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার পদুয়ার বাজার রেলক্রসিং এলাকায় চুয়াডাঙ্গা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী মামুন স্পেশাল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী মেইল ট্রেনের সংঘর্ষ হয়। ট্রেন বাসটিকে ইঞ্জিনের মুখে করে টেনেহিঁচড়ে প্রায় ৭০০ মিটার দূরে দৈয়ারা নামক স্থানে নিয়ে থামে। এ ঘটনায় বাসটি দুমড়েমুচড়ে প্রাণ হারান ৩টি শিশুসহ ১২ জন। গুরুতর আহত হয়েছেন বাসচালকসহ অন্তত ২৪ জন। হতাহতরা সবাই বাসের যাত্রী ছিলেন।
‘বিকট শব্দে ঘুম ভাঙতেই দেখি, ট্রেন বাসটিকে মুখে করে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে’।
দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে রেলওয়ের তদন্ত কমিটি চার গেটম্যানের গাফিলতি চিহ্নিত করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) আনিসুর রহমানকে প্রধান করে ছয় সদস্যের বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল রেলওয়ে। কমিটি সম্প্রতি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। তদন্তে রেলের কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) আনিসুজ্জামানকে পরোক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে, কারণ গেটম্যানের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি এই বিভাগের ওপর ন্যস্ত।
রেলের তদন্ত প্রতিবেদনে পদুয়ার বাজারের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় চার কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—রেলওয়ের চার গেটম্যানের নিয়মবহির্ভূতভাবে দায়িত্ব (ডিউটি) বদল; রেলক্রসিংয়ে সময়মতো গেট ব্যারিয়ার (প্রতিবন্ধক দণ্ড বা ফটক) না ফেলা, রেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার তদারকি ব্যর্থতা এবং বাসচালকের বেপরোয়া গতিতে বাস চালানো। এসব কারণে ট্রেন-বাসের সংঘর্ষে ১২ জন বাসযাত্রী নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২৪ জন।
এ ঘটনায় নিহত এক বাসযাত্রীর স্বজনের করা মামলায় রেলক্রসিংয়ের তিন গেটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ। তদন্ত কমিটির প্রধান আনিসুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ট্রেন ও বাসের ভয়াবহ সংঘর্ষের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করার পাশাপাশি যাঁদের দায়িত্বহীনতার কারণে এ ঘটনা ঘটেছে, তাঁদের চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে বেশ কিছু সুপারিশও দিয়েছেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য জানাতে রাজি হননি তিনি।
তদন্ত কমিটি চার গেটম্যানের মধ্যে মো. হেলাল উদ্দিনের জবানবন্দি নিয়েছে। তিনি দাবি করেন, শুক্রবার রাতের পালায় দায়িত্ব পালন করে চাঁদপুরে গ্রামের বাড়ি চলে যান। শনিবার রাতের দায়িত্ব পালন করতে নাজমুল ও কাউসার হোসেনকে বলেন এবং এর জন্য তাঁদের এক হাজার টাকা দেন। কিন্তু নাজমুল ও কাউসার দায়িত্ব পালন না করে রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। তাই গেট ফেলতে পারেননি এবং দুর্ঘটনা ঘটেছে।
রেলওয়ের তদন্তে কেবল মানবিক গাফিলতিই নয়, অবকাঠামোগত দুর্বলতাও উঠে এসেছে। ই/৪৭ স্পেশাল গেটে বিদ্যুৎ না থাকায় অ্যালার্ম বেল ও আইপি ফোন কার্যকর ছিল না। গেটকিপারদের জন্য নির্ধারিত ঘরে টয়লেট, পানি ও বিদ্যুতের সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। রেলের প্রকৌশল বিভাগের এসব দেখার কথা থাকলেও তাঁরা তদারকি করেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষ চার কারণে ঘটেছে—রেলওয়ের চার গেটম্যানের নিয়মবহির্ভূত দায়িত্ব বদল; রেলক্রসিংয়ে সময়মতো গেট ব্যারিয়ার না ফেলা, রেল কর্মকর্তার তদারকি ব্যর্থতা এবং বাসচালকের বেপরোয়া গতি। এসবের ফলে ১২ জন নিহত ও ২৪ জন আহত হয়েছেন।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটিও প্রায় একই কারণ চিহ্নিত করেছে। তবে তারা সহকারী স্টেশন মাস্টার, ট্রেনচালক ও সহকারী ট্রেনচালকের অবহেলা এবং রেলওয়ে ও সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের সমন্বয়হীনতাকেও দায়ী করেছে।
অ্যালার্ম বাজেনি গেটে
রেলওয়ের তদন্তে মানবিক গাফিলতির পাশাপাশি অবকাঠামোগত দুর্বলতাও প্রকাশ পেয়েছে। ই/৪৭ স্পেশাল গেটে বিদ্যুৎ না থাকায় অ্যালার্ম বেল ও আইপি ফোন কার্যকর ছিল না। গেটকিপারদের ঘরে টয়লেট, পানি ও বিদ্যুতের সঠিক ব্যবস্থা ছিল না। রেলের প্রকৌশল বিভাগ তদারকি করেনি। গেটে ফোন সেট পাওয়া যায়নি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার ব্যবস্থা ছিল না। কমিটির পর্যবেক্ষণে, দূরপাল্লার বাসটি স্বাভাবিকভাবে উড়ালসড়কের ওপর দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু নিচ দিয়ে রেলক্রসিং ব্যবহার করেছে।
প্রতিবেদনে গেটম্যানদের পাশাপাশি বাসচালককেও দায়ী করা হয়েছে। বাসচালক সতর্কতা নির্দেশক বোর্ড মেনে চললে এবং মোটরযান আইন অনুসরণ করলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। তাই তাঁকে প্রত্যক্ষভাবে দায়ী করা হয়েছে। তবে সংঘর্ষে বাসচালক গুরুতর আহত।
জেলা প্রশাসনের তদন্তে যা পাওয়া গিয়েছিল
কুমিল্লা জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি চার গেটম্যান মো. হেলাল উদ্দিন, মো. মেহেদী হাসান, কাউসার হোসেন ও নাজমুল হোসেনের দায়িত্বহীনতা চিহ্নিত করেছে। লালমাই রেলস্টেশনের সহকারী স্টেশনমাস্টার এবং ট্রেনের দুজন চালকের অবহেলাও উল্লেখ করা হয়েছে। বাসচালকের অদক্ষতা ও পরিবহনের সিদ্ধান্তহীনতা, ক্রসিংয়ে দুই পাশ না দেখা এবং ওভারপাস না ব্যবহার করে নিচ দিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।
পদুয়ার বাজারে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ইউলুপ নির্মাণকাজ চলছে। এর জন্য রেলক্রসিংয়ের পাশে দুটি ঘর নির্মিত হয়েছে, যা রেললাইন দেখতে বাধা দেয়। এখানে সওজ ও রেলওয়ের সমন্বয়হীনতা উঠে এসেছে।






