দক্ষিণাঞ্চলের মাঠে তরমুজের বাম্পার ফলন হলেও পাইকারের অভাবে চাষিরা উদ্বেগে আছেন। খরা ও লবণাক্ততার সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অনুকূল আবহাওয়ায় এবার প্রচুর উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু ক্রেতা না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় তারা হতাশ।

এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কম।
এস এম মাহবুব আলম, সহকারী পরিচালক, কৃষি বিপণন অধিদপ্তর

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরিশালসহ দক্ষিণ উপকূলের জমি লবণাক্ততা, খরা ও অতিবৃষ্টির শিকার হয়ে কৃষি খাতে বছরের পর বছর বিপর্যয় ঘটেছে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে স্থানীয় কৃষকরা প্রায় এক দশক ধরে লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ জমিতে তরমুজ চাষে ঝুঁকছেন। প্রতি বছর এর আওতা বাড়ছে। কখনো ভালো আবহাওয়ায় লাভ হয়, আবার অসময়ের ঝড়-বৃষ্টিতে লোকসান সামলাতে হয়। এবার খরা থাকলেও অসময়ে ঝড়-বৃষ্টি না হওয়ায় বাম্পার ফলন হয়েছে। কিন্তু পাইকার না থাকায় চাষিরা বিপাকে পড়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজ আবাদের কারণে এখানকার তরমুজের চাহিদা কমেছে।

চলতি বছর বরিশাল বিভাগে ৭০ হাজার ৩৬২ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৫৫ টন করে মোট ৩৮ লাখ ২১ হাজার ৭২৯ টন উৎপাদন হবে বলে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আশা করছেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানায়, বিভাগে সবচেয়ে বেশি তরমুজ আবাদ হয়েছে পটুয়াখালীতে—৩৫ হাজার ৫৭ হেক্টর জমিতে। এরপর ভোলায় ১৯ হাজার ৭৫৩ হেক্টর, বরগুনায় ১২ হাজার ৩২৪ হেক্টর, বরিশালে দুই হাজার ৭০৫ হেক্টর, পিরোজপুরে ৩৯৬ হেক্টর ও ঝালকাঠিতে ১২৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে।

বরগুনার আমতলী উপজেলায় এ বছর ৪ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষের লক্ষ্য ছিল, কিন্তু ৪ হাজার ৩০৯ হেক্টরে আবাদ হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ায় বাম্পার ফলন হলেও উৎপাদিত তরমুজ প্রায় ২৭০ কোটি টাকায় বিক্রির লক্ষ্য থাকলেও মৌসুম শুরুতেই ক্রেতার অভাবে বাজারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

আমতলীর বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা জানান, আগে বড় ব্যবসায়ীরা আমতলীর তরমুজ কিনে নাটোর, দিনাজপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করতেন। কিন্তু এবার উত্তরাঞ্চলে চাহিদা কম থাকায় তারা আগ্রহ দেখাচ্ছেন না।

গত সোমবার আমতলীর হলদিয়া, চাওড়া, আঠারোগাছিয়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক খেতে পেকে যাওয়া তরমুজ ক্রেতাসংকটে তুলছেন না চাষিরা। কোথাও কেটে খেতে ফেলে রেখেছেন।

হলদিয়া গ্রামের চাষি আল আমিন জানান, প্রায় ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন হেক্টর জমিতে তরমুজ চাষ করেছেন। কিন্তু ক্রেতা না থাকায় বিক্রি করতে পারছেন না। এভাবে চললে বিনিয়োগের টাকাও উঠবে না বলে তাঁর আশঙ্কা।

চাওড়া ইউনিয়নের পাতাকাটা গ্রামের চাষি মামুন মোল্লা বলেন, গত কয়েক বছর দেশের বিভিন্ন এলাকার বড় বড় ব্যবসায়ী এখানে এসে খেত থেকে তরমুজ কিনে ট্রাকে করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন, কিন্তু এবার তাঁরা আসছেন না। এতে স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।

আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, এ বছর তরমুজের উৎপাদন ভালো হয়েছে। তবে বাজারদর কম থাকায় চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পাচ্ছেন না। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে উপজেলায় তরমুজচাষিরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়বেন। তাঁরা বড় ব্যবসায়ীদের তরমুজ কিনতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

শুধু আমতলী নয়, পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলায়ও একই অবস্থা। এতে স্থানীয় চাষিদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নের চরচান্দুপাড়া গ্রামের কৃষক ফেরদৌস তালুকদার জানান, চলতি বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে তরমুজ আবাদ করেছিলেন। এখন পর্যন্ত তাঁর প্রায় ২১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। ফলন মোটামুটি ভালো হলেও বাজারে সঠিক মূল্য না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন তিনি।

ফেরদৌস তালুকদার বলেন, গত বছর যেখানে দুই গাড়ি তরমুজ প্রায় ৯ লাখ টাকা বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এবার ২ লাখ টাকাও পাওয়া যাচ্ছে না। ২ হাজার ২০০ টাকা মণ দরের তরমুজ ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। পাইকার না আসা এবং মোকামে চাহিদা কমে যাওয়ায় অন্তত ১২ লাখ টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন তিনি।

কলাপাড়া কৃষি কার্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর কলাপাড়ায় প্রায় তিন হাজার চাষি ৪ হাজার ৪৪৭ হেক্টর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। তবে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্ধেক চাষি লোকসানে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বরিশাল বিভাগের অন্য জেলাগুলোতেও একই চিত্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটি তরমুজ চাষের জন্য উপযোগী। নদীবেষ্টিত এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় জমি পানির নিচে থাকা এবং নদীর জোয়ার-ভাটার ফলে পলিমাটি জমে উর্বরতা বাড়ে। ফলে তুলনামূলক কম সার ব্যবহার করেও ভালো ফলন পাওয়া যায়।

দেশে কৃষিপণ্য বিপণনের দায়িত্বে আছে সরকারের কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিপণন অধিদপ্তর। জানতে চাইলে বরিশাল আঞ্চলিক কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক এস এম মাহবুব আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এবার উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অনেক চরাঞ্চলে ব্যাপক তরমুজের আবাদ হয়েছে। এতে এবার দক্ষিণাঞ্চলের তরমুজের চাহিদা অনেকটা কম। তবে এখন মৌসুম কেবল শুরু হয়েছে। যাঁরা আগাম তরমুজ উৎপাদন করেছেন, তাঁদের কিছুটা সমস্যা হতে পারে। তবে দিন যত যাবে, তরমুজের চাহিদা তত বাড়বে।