ঈদে পরিবারবর্গকে নিয়ে সিনেমahালে যাওয়া আমাদের দীর্ঘদিনের রীতি। এবারের ঈদেও তা অব্যাহত রয়েছে। কিন্তু সমস্যা দেখা দিয়েছে এই ঈদের পাঁচটি ছবির মধ্যে তিনটি—‘প্রিন্স; ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন ঢাকা’, ‘প্রেশার কুকার’ ও ‘রাক্ষস’—‘এ’ (অ্যাডাল্ট অনলি) সার্টিফিকেট পাওয়ায়। অনেক অভিভাবক অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের সঙ্গে এসব ছবি দেখছেন। এটি এবারের ঘটনা নয়, কয়েক বছর ধরে ঈদের মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমায় এমন হচ্ছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একাধিক প্রেক্ষাগৃহের টিকিট কাউন্টারের বিক্রয়কর্মীরা জানান, দর্শকরা জেনেশুনে টিকিট কাটছেন এবং ছবিগুলো উপভোগও করছেন।

প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা জানান, তাঁরা নিয়ম অনুসরণ করতে চান, কিন্তু অভিভাবকেরা চান না। তবে সরকারের নজরদারি দল সক্রিয় হলে প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা কঠোর হতে পারবেন।

এই প্রতিবেদক একাধিক অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছেন। ধানমন্ডির মনিরুল ইসলাম বলেন, “ছাত্রজীবন থেকে সিনেমা দেখার অভ্যাস। এখন স্কুলপড়ুয়া তিন সন্তানের বাবা। এবার ঈদে তিনটি ছবি দেখেছি। আমাদের পাঁচজনের পরিবার। যখন ছবি দেখতে যাওয়ার সময়, তখন সন্তানদের বাসায় রেখে যাওয়া সম্ভব হয় না। তাই না চাইলেও একসঙ্গে পরিবারের সবাইকে নিয়ে ছবি দেখা হয়ে যায়। এবার যেমন একটি ছবি পরিবার নিয়ে দেখার সময় কোনো সমস্যা হয়নি। পরে জানলাম, সেটির রেটিং ছিল “ইউ”। আর বাকি দুটি ছবিতে অভিজ্ঞতা বললে বলতে হয়, কিছু সংলাপ ও দৃশ্য অযথা রাখা হয়েছে। পরে শুনি, ছবি দুটির রেটিং “এ”। ভায়োলেন্স ও শিশুদের মানসিক প্রভাবের কথা বিবেচনা করলে মুক্তির আগে বেশি প্রচারণা দরকার ছিল।”

ঢাকার গুলশানের একটি পরিবার ও তাদের বন্ধুবান্ধব মিলে ১৩ জন উত্তরা সেন্টার পয়েন্টে ‘এ’ রেটিংয়ের সিনেমা দেখেছেন। তাঁদের মধ্যে দুজন বলেন, সিনেমার দুই থেকে তিনটি সংলাপ আর একটি দৃশ্য ছাড়া পুরো সিনেমা উপভোগ্য ছিল। দেখার সময় কোনো অস্বস্তি হয়নি।

প্রেক্ষাগৃহের মালিকেরা জানান, তাঁরা নিয়ম মানতে চান কিন্তু অভিভাবকরা চান না। তবে সরকারের নজরদারি দল সক্রিয় হলে তারা কঠোর হতে পারবেন। ঢাকার লায়ন সিনেমাসের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা আবদুল খালেক বলেন, “যাঁরা অনলাইনে টিকিট কিনছেন, তাঁরা দেখছেন, কোনটি অ্যাডাল্ট সিনেমা। সরাসরি আসা দর্শককে আমরা জানাই, বাচ্চা প্রবেশ করবে না। অভিভাবকেরা চাইলে প্রবেশ করাতে পারেন। তবে অধিকাংশ দর্শক অ্যাডাল্ট রেটিংয়ের গুরুত্ব বোঝেন না। ঈদের সময় চাপ বেশি। আমরা “না” বললে পরিস্থিতি অন্য রকম হয়ে যায়।”

মির্জা আবদুল খালেক আরও বলেন, “প্রযোজকদের এ বিষয়ে প্রচারণা চালানো দরকার। আমাদের দেশে খুব বেশি অ্যাডাল্ট রেটেড সিনেমা হয়নি। এখন যখন শুরু হয়েছে, প্রযোজক-পরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া উচিত। দর্শকের সচেতন হওয়া জরুরি। অভিভাবকেরা নিজেদের দায়িত্ব নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। আমরা যদি বাধা দিই, গন্ডগোল হতে পারে।”

যাঁরা অনলাইনে টিকিট কিনছেন, তাঁরা দেখছেন, কোনটি অ্যাডাল্ট সিনেমা। সরাসরি আসা দর্শককে আমরা জানাই, বাচ্চা প্রবেশ করবে না। অভিভাবকেরা চাইলে প্রবেশ করাতে পারেন। তবে অধিকাংশ দর্শক অ্যাডাল্ট রেটিংয়ের গুরুত্ব বোঝেন না। ঈদের সময় চাপ বেশি। আমরা “না” বললে পরিস্থিতি অন্য রকম হয়ে যায়।
লায়ন সিনেমাসের প্রতিষ্ঠাতা মির্জা আবদুল খালেক

অপ্রাপ্তবয়স্কদের ওপর অ্যাডাল্ট কনটেন্টের প্রভাব নিয়ে জানতে চাইলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহিত কামাল বলেন, “অপ্রাপ্তবয়স্করা যখন অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখে, তখন মস্তিষ্কের মাস্টারগ্ল্যান্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে অল্প বয়সেই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কের মতো আচরণ করে। এই যে নির্ধারিত বয়সের আগে দ্রুত পরিণত হয়ে যাওয়া, প্রাকৃতিকভাবে যেটা ১৪-১৫ বছরে হওয়ার কথা, সেটা ৯-১০, এমনকি ১১ বছরে হয়ে যাচ্ছে, এটা অবশ্যই আগামী প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর। অল্প বয়সে অপ্রাপ্তবয়স্করা জৈবিক চাহিদার কাছে পরাজিত হলে তাদের নৈতিক সত্তা উন্নত হবে না। তাদের মধ্যে ভোগবাদী সত্তা প্রাধান্য পাবে। নৈতিক সত্তার উন্নতি হয় আমাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় অনুশাসন, সমাজ-পরিবার থেকে। যখন তারা মুঠোফোন বা সিনেমার মধ্য দিয়ে নিজেদের অন্যভাবে আবিষ্কার করে, তখন তারা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। তাই অভিভাবকদের উদ্দেশে আমি বলতে চাই, প্রেক্ষাগৃহে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখতে গেলে টিনএজারদের সঙ্গে নেবেন না। অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি।”

অপ্রাপ্তবয়স্করা যখন অ্যাডাল্ট কনটেন্ট দেখে, তখন মস্তিষ্কের মাস্টারগ্ল্যান্ড সক্রিয় হয়ে ওঠে। এতে অল্প বয়সেই শিশুরা প্রাপ্তবয়স্কের মতো আচরণ করে। এই যে নির্ধারিত বয়সের আগে দ্রুত পরিণত হয়ে যাওয়া, প্রাকৃতিকভাবে যেটা ১৪-১৫ বছরে হওয়ার কথা, সেটা ৯-১০, এমনকি ১১ বছরে হয়ে যাচ্ছে, এটা অবশ্যই আগামী প্রজন্মের জন্য ক্ষতিকর।
অধ্যাপক মোহিত কামাল

ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘এ’ সার্টিফিকেটের ‘প্রেশার কুকার’ সিনেমার নির্মাতা রায়হান রাফী বলেন, “একেক গল্প একেক ধরনের সার্টিফিকেট দাবি করে। আমাদের দায়িত্ব সিনেমা বানানো পর্যন্ত। এর পরের বিষয় প্রেক্ষাগৃহ ও দর্শকের। নেতিবাচক মত থাকলেও দর্শক দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করছে। মানুষের বাসার মধ্যে এখন নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম—সবই আছে। সারা পৃথিবীর কনটেন্ট দেখছে তারা। তারা যথেষ্ট ম্যাচিউরড। বাংলাদেশের কনটেন্টকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে গেলে সারা পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। ঘটনা হলো, আপনি অশ্লীলতা দেখাচ্ছেন কি না। গল্পের প্রয়োজনে যতটুকু দেখানো দরকার, আমাদের দেশের কথা ভেবে ততটুকু দেখালে কোনো সমস্যা দেখি না। গল্পের প্রয়োজনে আমাদের সিনেমায় যতটুকু দেখানোর, তা দেখিয়েছি।”

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের উপপরিচালক মঈনউদ্দীন বলেন, “ছবিটি কাদের জন্য, সনদেই তা স্পষ্ট। প্রেক্ষাগৃহের মালিকদের দায়িত্ব দর্শকদের সচেতন করা। প্রযোজককেও ছবি সম্পর্কে প্রচারণা চালাতে হবে।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের নজরদারি টিম রয়েছে, তবে তা সীমিত। তারা নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, দেখছে এবং অননুমোদিত প্রদর্শনী নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে প্রেক্ষাগৃহের মালিকের দায়িত্ব অনেক বেশি। অভিভাবকের সচেতনতাও অপরিহার্য।”