চলতি মৌসুমে আজ বুধবার সুন্দরবনে মধু আহরণ শুরু হলেও প্রথম দিন থেকেই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের ছায়া নেমে এসেছে। বনদস্যুদের তীব্রতর কার্যকলাপের কারণে খুলনার কয়রা উপজেলা থেকে বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কোনো মৌয়াল বনে ঢোকেননি। এই পরিস্থিতি মধু সংগ্রহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে।

মৌয়ালরা অভিযোগ করেন, ডাকাতদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া বনে প্রবেশ করে নিরাপদে কাজ করা সম্ভব নয়। একাধিক ডাকাত দলের দাবি মেনে টাকা না দিলে অপহরণ, নির্যাতন বা লুটপাটের আশঙ্কা রয়েছে। তাঁদের কথায়, প্রতি নৌকার জন্য ডাকাতেরা ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করে। কোথাও কোথাও জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে চাঁদা দিতে হচ্ছে।

বন বিভাগের তথ্যমতে, ১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ৩১ মে পর্যন্ত চলবে এই মৌসুম। চলতি বছর সুন্দরবনের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু ও ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। কিন্তু মৌসুম শুরুতেই মৌয়ালদের অনাগ্রহ লক্ষ্য পূরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

আজ সকালে কয়রার কাশিয়াবাদ ফরেস্ট স্টেশনের কাছে শাকবাড়িয়া নদীর তীরে গিয়ে দেখা গেছে, অন্যান্য বছরের মতো কোনো চাঞ্চল্য নেই। সারি সারি নৌকা বা প্রস্তুতির ব্যস্ততা দেখা যায়নি। গত বছর এই দিনে মৌয়ালদের কোলাহলে মুখরিত এলাকায় আজ নীরবতা নেমেছে। বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত কেউ বন বিভাগের কার্যালয় থেকে অনুমতিপত্র (পাস) নিতে আসেনি।

সুন্দরবনের বানিয়াখালী ও নলীয়ান ফরেস্ট স্টেশনের কর্মকর্তারাও একই তথ্য জানিয়েছেন। তাঁদের মতে, সকাল পর্যন্ত কোনো মৌয়াল পাস নিতে আসেননি।

শাকবাড়িয়া নদীর তীরে কয়েকজন মৌয়াল নাম গোপন রেখে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ডাকাতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা দিয়ে তবেই বনে ঢুকতে হয়। এখনো কোনো সমঝোতা হয়নি, তাই কেউ পাস নিচ্ছে না। আলোচনা চলছে—সমঝোতা হলে সবাই একসঙ্গে বনে যাবেন।

মৌয়াল আক্তারুল ইসলাম বলেন, ‘বনে এখন বাঘ-কুমিরের চেয়েও বড় ভয় দস্যু। একেকটা দস্যুবাহিনী নৌকাপ্রতি ৫০ হাজার টাকা চাচ্ছে। কোন বাহিনীকে টাকা দেব আর কাদের দেব না, যদি তাদের সামনে পড়ি এই দুশ্চিন্তাই বেশি। মনে হচ্ছে এবার সুন্দরবনে মধু কাটতে যেতে দু-এক দিন দেরি হবে।’

মদিনাবাদ গ্রামের মৌয়াল হাবিবুল্লাহ শেখ বলেন, ‘খাবার পানি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সবকিছু নিয়েই বনে যেতে হয়। প্রথম ধাপে ১৪ দিন বনে থেকে মধু সংগ্রহ করে ফিরে এসে আবার যেতে হয়। গত বছর মধুর ভালো দাম পেয়েছিলাম। কিন্তু এবার দস্যুদের উৎপাত বেড়েছে, কবে যাব, কী হবে—কিছুই বুঝতে পারছি না।’

মৌয়ালদের বর্ণনায়, বনের ভিতর একজন নৌকা পাহারায় থাকেন, বাকিরা জঙ্গলে ঢুকে মৌচাক খুঁজে বেড়ান। মৌমাছির ওড়াউড়ি ও বাতাসের গতি দেখে চাকের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। চাক পেলে গামছা দিয়ে মুখ ঢেকে ধোঁয়া দিয়ে মৌমাছি তাড়িয়ে দা দিয়ে চাক কেটে ড্রামে মধু সংগ্রহ করা হয়।

কয়রার মৌয়াল আবুল কালাম আজাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘কাঁকড়া ধরে ফেরার সময়ই দস্যুরা বলে দিয়েছে, মধু কাটতে সুন্দরবনে ঢুকলে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা দিতে হবে। এলাকায় তাঁদের লোক আছে, তাদের সঙ্গে কথা বলে টাকা দিয়েই বনে নামতে হবে।’

স্থানীয় জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের অভিযোগ, সুন্দরবনে শরিফ, জাহাঙ্গীর, ছোট সুমন, দুলাভাই ও জোনাব বাহিনীসহ কয়েকটি দস্যু দল সক্রিয়। তারা বনজীবীদের অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত। চাঁদা না দিলে বনে কাজ করা ঝুঁকিপূর্ণ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, দস্যু দমনে অভিযান তীব্র করা হয়েছে। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে জোনাব বাহিনীর হাতে জিম্মি এক জেলেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগের দিন ছোট সুমন বাহিনীর একটি আস্তানা ভেঙে দস্যুতার মালামাল জব্দ করা হয়।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম বলেন, বনদস্যুদের স্থির হতে দেওয়া হচ্ছে না। একের পর এক অভিযান চলছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাঁদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।

কিন্তু বাস্তবে চিত্র ভিন্ন। দস্যু-আতঙ্কে মৌয়ালদের অংশগ্রহণ কমছে। ২০২৪ সালে সুন্দরবন থেকে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ হয় যেখানে ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে—প্রায় ৩৫ শতাংশ কম। একই সময় মৌয়ালের সংখ্যা ৮ হাজার থেকে কমে ৫ হাজারে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এবার পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

মধু ব্যবসায়ীরাও চিন্তিত। তাঁদের কথায়, প্রতি বছর মৌয়ালদের আগাম অর্থ (দাদন) দেওয়া হয় কিন্তু এবার কেউ যোগাযোগ করছে না। উৎপাদন কমলে বাজারে সরবরাহ সংকট, দামবৃদ্ধি এবং সরকারের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হাছানুর রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, মধু আহরণের মৌসুমে নিরাপত্তা নিশ্চিতে টহল জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকে রক্ষায় মৌয়ালদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নিয়মানুযায়ী একজন মৌয়াল ১৪ দিনে সর্বোচ্চ ৫০ কেজি মধু ও ১৫ কেজি মোম সংগ্রহ করতে পারবেন।