জীবন বাইরে থেকে সবকিছু ঠিকঠাক মনে হলেও ভেতরে একধরনের শূন্যতা অনুভব করি কখনো না কখনো। একই রুটিনে কাটে প্রতিদিন—সকালে এক কাপ চা বা কফি, একই অফিস, একই ধরনের কথাবার্তা। কিন্তু অবাক হবেন জেনে, এই একঘেয়েমি দূর করার উপায় হতে পারে নতুন ভাষা শেখা। এটা শুধু শব্দ, বাক্য বা ব্যাকরণ শেখা নয়, বরং সেই ভাষার মানুষ ও তাঁদের সংস্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট করে। এতে আপনি আবিষ্কার করেন এক রঙিন নতুন জগৎ।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে বলি। গত বছর পরিবার নিয়ে শ্রীলঙ্কায় গিয়েছিলাম। সারা সপ্তাহ আমাদের সঙ্গ ছিলেন শ্রীলঙ্কান শোফার কাম গাইড সঞ্জয় বান্দারা। তিনি আমাদের সঙ্গে সাবলীল ইংরেজিতে কথা বললেও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে তামিল ভাষায় কথা বলতেন মাঝেমধ্যে। তাঁর কাছ থেকেই শিখলাম, শ্রীলঙ্কায় মূলত দুটি ভাষা প্রচলিত—সিংহলি ও তামিল।

সঞ্জয় দুটি ভাষাই জানেন, তবে তামিলে তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য বেশি। তাঁর কাছ থেকে কয়েকটা তামিল শব্দও শিখে নিয়েছিলাম।

দেশে ফিরেও তামিলের প্রতি আগ্রহ কমেনি, বরং বেড়েছে। শুধু শ্রীলঙ্কাই নয়, দক্ষিণ ভারতের একাংশও এই ভাষা ব্যবহার করে। তামিল ইউটিউবার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের অনুসরণ শুরু করলাম।

বাংলার মতো তামিল সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, পৃথিবীতে এখনো লোকমুখে প্রচলিত প্রাচীন ভাষাগুলোর একটি তামিল। এভাবে তামিল আমাকে এক নতুন দুনিয়ার দরজা খুলে দিল।

আমরা ভাষাকে সাধারণত যোগাযোগের মাধ্যম মনে করি। কিন্তু এটা তার চেয়ে অনেক বেশি। ভাষা আমাদের চিন্তার কাঠামো গড়ে, পৃথিবী বোঝার ধরনকে প্রভাবিত করে।

উদাহরণস্বরূপ জাপানি সংস্কৃতি। এই ভাষায় সরাসরি ‘না’ বলা অনেক সময় অমার্জিত মনে হয়। সেখানে ইঙ্গিতে বা ঘুরিয়ে কথা বলা স্বাভাবিক। অন্যদিকে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে সরাসরি মত প্রকাশই স্বাভাবিক। নতুন ভাষা শিখলে এমন নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পথ খুলে যায়।

শৈশবে নতুন জিনিস সহজে শিখে ফেলি আমরা। কিন্তু বয়স বাড়লে অভ্যাসের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। একই কাজ, একই চিন্তা।

নতুন ভাষা শেখায় চেনা গণ্ডি থেকে বেরিয়ে আসতে হয়। ফলে অভ্যাসের চক্র ভাঙে। নতুন শব্দ মনে রাখা, ব্যাকরণ বোঝা, উচ্চারণ আয়ত্ত করা—এসব মস্তিষ্ককে নতুন করে সক্রিয় করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, একাধিক ভাষা জানা মানুষের মস্তিষ্কে স্নায়বিক সংযোগ শক্তিশালী হয় এবং চিন্তার নমনীয়তা বাড়ে। সহজ কথায়, নতুন ভাষা মস্তিষ্ককে তরুণ করে।

ভাষা শেখায় ভুল হবেই। ভুল উচ্চারণে হাসির পরিস্থিতি হতে পারে, সহজ বাক্য বলতে অনেক সময় লাগতে পারে। কিন্তু এই ভুলগুলো ধৈর্য ও সাহস বাড়ায়।

আমরা শিখি, প্রথমে না পারাটা ব্যর্থতা নয়, শেখার স্বাভাবিক ধাপ। এই মনোভাব জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ে। নতুন দক্ষতা শেখা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া তখন ভয়ের আর হয় না।

নতুন ভাষা মানে নতুন মানুষ, গল্প, সংস্কৃতি। হয়তো নতুন বন্ধু, শহরের সম্পর্ক বা অজানা সাহিত্য-সংগীত আবিষ্কার করবেন। তখন পৃথিবী আর সীমাবদ্ধ মনে হয় না, বৈচিত্র্যময় বলে প্রতিভাত হয়।

অনেকে মনে করেন ভাষা শেখাতে বিশেষ প্রতিভা বা কম বয়স দরকার। বাস্তবে তা নয়। ধৈর্য ও আগ্রহ নিয়ে যে কেউ শুরু করলে এগোতে পারে। সবচেয়ে জরুরি শুরু করা।

যেদিন প্রথম শব্দ শিখবেন, সেদিন থেকে ‘আমিও পারি’ অনুভব করবেন। জীবন একই থাকলেও ভেতরের পৃথিবী বদলে যাবে।

সূত্র: মিডিয়াম