জেমস ক্যামেরনের সিনেমা ‘টাইটানিক’-এর ‘মাই হার্ট উইল গো অন’ গান গেয়ে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন কানাডীয় গায়িকা সেলিন ডিওন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অনেক স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছেন। তবে বিরল রোগে আক্রান্ত হয়ে কয়েক বছর ধরে গান থেকে দূরে রয়েছেন তিনি। আজ ৩০ মার্চ তাঁর জন্মদিন। এ উপলক্ষে তাঁর জীবন ও ক্যারিয়ারের দিকে এক নজর।

শিকড় থেকে শিখরে
১৯৬৮ সালে কানাডার কুইবেক প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন সেলিন ডিওন। তিনি ১৪ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট। দরিদ্র কিন্তু সংগীতপ্রিয় পরিবারে বেড়ে ওঠা সেলিন ছোটবেলা থেকেই গানে নিজের জগৎ খুঁজে পান। তাঁর মা ও ভাই মিলে একটি গান লিখে দেন, যা শুনে মুগ্ধ হন ম্যানেজার রেনে অ্যাঞ্জেলিল। এখান থেকেই শুরু হয় তাঁর অবিশ্বাস্য সাফল্যের গল্প। রেনে নিজের বাড়ি বন্ধক রেখে সেলিনের প্রথম অ্যালবাম তৈরি করেন। এই বিশ্বাস ও বিনিয়োগ পরে বিশ্বসংগীতের এক বিরল সফলতায় পরিণত হয়।

ভাষা পেরিয়ে বিশ্বজয়
ফরাসি ভাষার গান দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও সেলিন দ্রুত ইংরেজি সংগীতে নিজের স্থান করে নেন। নব্বইয়ের দশকে তিনি পপসংগীতের অবিসংবাদিত রানি হয়ে ওঠেন।

চেনা–অচেনা সেলিন ডিওন
চার দশকের বেশি সময় ধরে গান গাইছেন সেলিন ডিওন, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ গায়িকাদের একজন তিনি। এ পর্যন্ত তাঁর অ্যালবাম ২৫০ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। তাঁর গাওয়া জনপ্রিয় গানের মধ্যে আছে ‘দ্য পাওয়ার অব লাভ’, ‘থিংক টোয়াইস’, ‘বিকজ ইউ লাভড মি’, ‘ইটস অল কামিং ব্যাক টু মি নাউ’, ‘দ্যাটস দ্য ওয়ে ইট ইজ’, ‘অ্যাই অ্যাম অ্যালাইভ’ ইত্যাদি।

সেলিনের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মাইলফলক ‘মাই হার্ট উইল গো অন’, যা ‘টাইটানিক’ সিনেমার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় জয় করে। এই গান এক প্রজন্মের আবেগ হয়ে ওঠে। এছাড়া ‘দ্য পাওয়ার অব লাভ’, ‘বিকজ ইউ লাভড মি’, ‘ইটস অল কামিং ব্যাক টু মি নাউ’—প্রতিটি গানেই তাঁর কণ্ঠ অনুভূতিকে ছুঁয়ে যায়।

সেলিনের কণ্ঠের বিশেষত্ব শুধু শক্তিতে নয়, আবেগেও। উচ্চ স্বরের নিখুঁত নিয়ন্ত্রণ, দীর্ঘ নোট ধরে রাখার ক্ষমতা এবং গানের কথাকে নিজের করে নেওয়ার দক্ষতা তাঁকে আলাদা করে। সেলিন গান করেন না—তিনি গল্প বলেন। তাঁর কণ্ঠে প্রেম বাস্তব মনে হয়, বিচ্ছেদ হৃদয়বিদারক।

ভালোবাসা, যা সীমা মানেনি

সেলিনের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অংশ তাঁর প্রেমকাহিনি। তাঁর ম্যানেজার রেনে অ্যাঞ্জেলিল—যিনি ক্যারিয়ার গড়ে দিয়েছিলেন—তাঁর সঙ্গেই প্রেম ও বিয়ে হয়। বয়সের ব্যবধান নিয়ে বিতর্ক সত্ত্বেও তাঁদের সম্পর্ক ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। ২০১৬ সালে রেনের মৃত্যু এবং একই সময়ে ভাইকে হারানো সেলিনের জন্য বড় ধাক্কা। এই কঠিন সময়েও তিনি থেমে যাননি। লাস ভেগাসের রেসিডেন্সি শো দিয়ে আবার মঞ্চে ফিরে জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনেন।

বিরল রোগের সঙ্গে লড়াই
২০২২ সালের ডিসেম্বরে জটিল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত হওয়ার কথা প্রথম প্রকাশ্যে জানান সেলিন ডিওন। তিনি বলেছিলেন, “অনেক দিন ধরেই শরীর ভালো যাচ্ছিল না। পরীক্ষা–নিরীক্ষার পর স্টিফ পারসন সিনড্রোম ধরা পড়ে। এ রোগের কারণে হাঁটতে ও গান গাইতে সমস্যা হচ্ছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ সমস্যা আমার জীবনের সব ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলছে। আমি নিজের কণ্ঠ ব্যবহার করে গাইতে পারছি না।” এই রোগে পেশিতে টান পড়ে, ফলে পেশির উপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। সম্পূর্ণ সুস্থতার পরিসংখ্যান কম। সেলিন জানিয়েছেন, থেরাপিস্টের সঙ্গে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছেন। জাতিসংঘের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথের তথ্যমতে, এই রোগের কোনো কার্যকর চিকিৎসা নেই।

অলিম্পিকে ফেরা
“আমি যদি দৌড়াতে না পারি, হাঁটব। হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দেব। তবু আমি কোনোভাবেই থামতে চাই না।” ২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আই অ্যাম: সেলিন ডিওন’ তথ্যচিত্রে বলেছিলেন সেলিন। শরীরের অবস্থা সত্ত্বেও ২০২৪ সালের প্যারিস অলিম্পিকের উদ্বোধনীতে সংগীত পরিবেশন করেন তিনি। ২০২০ সালের মার্চে নিউ জার্সিতে শেষ কনসার্টের পর করোনা ও রোগের কারণে মঞ্চ থেকে দূরে ছিলেন।

নতুন ফেরা
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, সেলিনের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। চলতি বছর কনসার্টে ফিরতে চান তিনি। আগামী সেপ্টেম্বরে প্যারিসে কনসার্ট দিয়ে মঞ্চে ফেরা হতে পারে।

রয়টার্স, বিলবোর্ড অবলম্বনে