পশ্চিমবাংলার দিঘার তালসারি সৈকতে ধারাবাহিকের শুটিংয়ের সময় অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের মর্মান্তিক মৃত্যু নিয়ে উঠেছে বহু প্রশ্নের সৃষ্টি। দুর্ঘটনা ঘটল কীভাবে—শুটিং চলাকালীন না শেষ হওয়ার পর? নিরাপত্তায় ছিল কোনো ত্রুটি? এসবের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
গতকাল রোববার সন্ধ্যার পর ঘটনাটি ঘটে। রাতেই রাহুলের মরদেহ তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আজ সোমবার সেখানে ময়নাতদন্ত হওয়ার কথা। সেই প্রতিবেদন থেকে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। ভিডিও ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য মিলিয়ে তদন্তকারী সংস্থা ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করার চেষ্টা করছে।
ভিডিও ফুটেজ ও সাক্ষীদের বর্ণনায় যা ধরা পড়েছে
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময়ের ভিডিও ফুটেজ তাদের হাতে এসেছে। তালসারি সৈকতের শুটিং সেটে একাধিক ক্যামেরা ছিল, সেগুলোর ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। প্রাথমিক তথ্যমতে, ‘ভোলে বাবা পার করেগা’ ধারাবাহিকের একটি নাচের দৃশ্য শুট হচ্ছিল। রাহুল ও সহ-অভিনেত্রী শ্বেতা গোড়ালিসমান পানিতে দাঁড়িয়ে অভিনয় করছিলেন।
ভিডিও ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, শুটিংয়ের সময় দুজন ধীরে ধীরে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যান। কিছুটা এগিয়ে শ্বেতা ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যান। তাকে ধরতে গিয়ে রাহুলও পড়ে যান বলে ধারণা। তখন সমুদ্রে জোয়ার শুরু হয়। পানির স্রোতে রাহুল কিছুটা দূরে ভেসে যান। ইউনিটের সদস্যরা দ্রুত শ্বেতাকে উদ্ধার করে, কিন্তু রাহুলকে তাৎক্ষণিক উদ্ধার সম্ভব হয়নি। প্রায় দুই ঘণ্টার তল্লাশির পর টেকনিশিয়ানরা তাকে উদ্ধার করেন।
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডলের বক্তব্য
পরিচালক শুভাশিস মণ্ডল জানান, বিকেল প্রায় পাঁচটার দিকে শুটিং চলছিল। দৃশ্যমতে, সাগরপাড়ে অল্প পানিতে অভিনয়ের কথা ছিল। তাঁর মতে, রাহুল হঠাৎ নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যান। ইউনিট থেকে বারবার থামতে বলা সত্ত্বেও তিনি এগিয়ে যান। একপর্যায়ে কোমরসমান পানিতে পৌঁছে যান। পরিচালক বলেন, তখনও শ্বেতার হাত ধরে ছিলেন রাহুল। ঝুঁকি বুঝে ইউনিটের সদস্য ও কাছাকাছি নৌকার লোকেরা এগিয়ে আসেন। এ সময় রাহুল ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। ঢেউয়ে ডুবে পড়েন এবং কিছু পানি গিলে ফেলেন। দ্রুত তাকে টেনে তোলা হয়, কিন্তু পরিস্থিতি গুরুতর হয়।
একটি ঢেউয়ের ধাক্কা
ধারাবাহিকের নির্বাহী প্রযোজক শান্তনু নন্দী ভারতীয় গণমাধ্যমকে বলেন, শুটিং প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল। একটি ড্রোন শট নেওয়ার কথা ছিল গোড়ালিসমান পানিতে। তাঁর দাবি, সেখান থেকে কিছুটা এগিয়ে যান রাহুল। সতর্ক করা সত্ত্বেও তিনি এগিয়ে যান। পরে একটি ঢেউয়ে পা হড়কে যায়। ঘটনাটি পাঁচ থেকে সাত মিনিটের মধ্যে ঘটে যায়। ইউনিটের সদস্য ও নৌকার লোকেরা দ্রুত পানিতে নেমে উদ্ধারের চেষ্টা করেন।
উদ্ধার ও তদন্তে নতুন প্রশ্ন
উদ্ধারের পর রাহুলকে দ্রুত দিঘা সরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, গাড়িতে তোলার সময় তার জ্ঞান ছিল। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
কিছু সূত্র দাবি করেছে, শ্বেতাকে বাঁচাতে গিয়ে রাহুল পানিতে পড়েন। তবে এটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত নয়। দিঘা থানায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা হয়েছে। ওডিশা পুলিশও তদন্তে যুক্ত। শুটিংয়ের নিরাপত্তা যথাযথ ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শুটিংয়ের অনুমতি নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটাও প্রশ্নের মুখে। এখন সবার নজর আজ তমলুক মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে হওয়ার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে, যা থেকে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন ভারতীয় গণমাধ্যম।






