বলিউডে বয়স বাড়লে নায়করা সাধারণত চরিত্রাভিনয়ের দিকে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু অনিল কাপুর এই নিয়ম মানতে চান না। ৬৯ বছর বয়সেও তাঁর নতুন ছবি ‘সুবেদার’-এ নায়কোচিত দাপট ফুটে উঠেছে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার ভূমিকায় তাঁর উপস্থিতি, চোখের ভাষা এবং অ্যাকশন—সবকিছুতে প্রমাণ হয়েছে যে বয়স কেবল একটা সংখ্যা।

পরিচালক সুরেশ ত্রিবেণির ‘সুবেদার’ অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা অর্জুন মৌর্যের গল্প। সীমান্তে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালনের পর তিনি নিজের শহরে ফিরে আসেন। স্ত্রীর মৃত্যুর পর মেয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক জটিল হয়। অতীতের দায়িত্ব এবং ব্যক্তিগত জীবনের দূরত্বের এই দ্বন্দ্বই ছবির আবেগের মূল কেন্দ্রবিন্দু। ছবি ও অনিলের অভিনয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ট্রেলার উন্মোচনের রাতে
মুক্তির আগে মুম্বাইয়ের আরব সাগরের তীরবর্তী এক রেস্তোরাঁয় জমকালো অনুষ্ঠানে প্রকাশ করা হয় ‘সুবেদার’-এর ট্রেলার। অ্যামাজন প্রাইম ভিডিওর আয়োজনে অনিল কাপুর, সৌরভ শুক্লা, মোনা সিং, আদিত্য রাওয়াল, রাধিকা মদন, ফয়জল মালিক, খুশবু সুন্দর, সুরেশ ত্রিবেণি সহ তারকারা উপস্থিত ছিলেন।

ঝলমলে সন্ধ্যায় নতুন ছবি নিয়ে অনিল কাপুর বলেন, “ছবিটি আমার জন্য খুবই বিশেষ। আমার ক্যারিয়ারে এটি অন্যতম চ্যালেঞ্জিং চরিত্র। আমি তো চ্যালেঞ্জ খুব ভালোবাসি। সব সময়ের মতো এবারও মনপ্রাণ দিয়ে কাজ করেছি। আমার চরিত্রের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি। আশা করি, দর্শকদের ছবিটি ভালো লাগবে।” দীর্ঘ চার দশকের ক্যারিয়ারে নতুন চ্যালেঞ্জই তাঁকে অভিনয়ে আকর্ষণ করে।

ক্যামেরা অন হলেই জাদু
ছবিতে অনিল কাপুরের বেশ কয়েকটি অ্যাকশন দৃশ্য বয়সের তুলনায় বিস্ময়কর। তিনি বলেন, “চরিত্রটি যখন আমাকে প্রস্তাব করা হয়, তখন মনে হয়েছিল, এত অ্যাকশন পারব তো? শুটিংয়ের আগে একটু দুশ্চিন্তাও ছিল। পায়েও একটু সমস্যা ছিল, কিন্তু আমি সুরেশ সাহেবকে তা বলিনি। ছয়-সাত জোড়া জুতা বদলেছি; ভাবছিলাম কোনো জুতায় হয়তো পায়ের সমস্যা কম হবে।” হাসতে হাসতে যোগ করেন, “কিন্তু ক্যামেরা অন হতেই সব যেন নিজে থেকেই হয়ে যায়। কেন হয়, জানি না। ক্যামেরা অন হওয়ামাত্রই অ্যাকশন করে ফেলি, ঘোড়ায় চড়ি, মোটরসাইকেলে উঠি, আবার গাড়িও চালাই। ধুলামাটি মেখেও কাজ করি, কোনো অসুবিধা হয় না।”

ছবির শুটিং ছিল কষ্টসাধ্য। অনিল কাপুর জানান, অনেকবার দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়েছে। তিনি বলেন, “কখনো কখনো ১৬ ঘণ্টা কাজ করেছি। এমনও হয়েছে, সকাল সাতটায় শুটিং শুরু করেছি, তারপর কখন যে পরদিন সকাল সাতটা হয়ে গেছে, বুঝতেই পারিনি। তারপর দুপুর পর্যন্ত শুটিং চলেছে। ক্যামেরা অন হলেই কী হয়ে যায়, জানি না। তবে ভালো কাহিনি আমাকে সব সময় ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে।”

বাড়িতে এখনো একই মানুষ
পর্দায় সুপারস্টার হলেও ব্যক্তিগত জীবনে অনিল কাপুর নিজেকে একই মানুষ মনে করেন। তিনি বলেন, “এতগুলো ছবি করেছি, কিন্তু বাড়িতে এ নিয়ে আমার কোনো কদর নেই। পরিবারে আমার কেউ ভক্ত নেই। বাড়িতে আমার অবস্থান আগে যেমন ছিল, এখনো তেমনই আছে। এখনো স্ত্রীর কাছে পকেট খরচ চাই। বলি, একটু টাকা দাও তো। আউটডোর শুটিংয়ে যাচ্ছি, ১০-১৫ হাজার টাকা নগদ দিতে বলি।” রসিকতা করে বলেন, “আমি কী ছবি করছি, কোথায় যাচ্ছি, তার বিন্দুবিসর্গ আমার স্ত্রী জানে না। আমি একই মানুষ আছি, আর একই থাকতে চাই।”

নায়িকাদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতেই মজা করে অনিল বলেন, “আজকাল কোনো নায়িকাই আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি নয়। সবাই তরুণ ছেলেদের সঙ্গে কাজ করতে চায়। যারা সিনিয়র, তারাও আমার সঙ্গে কাজ করতে রাজি নয়। কই যাব!”

বয়স শুধুই সংখ্যা
‘সুবেদার’-এ অনিলের মেয়ে ‘শ্যামা’র ভূমিকায় রাধিকা মদন। তাঁর মতে, ছবির শক্তিশালী দিক বাবা-মেয়ের সম্পর্ক। তিনি বলেন, অ্যাকশন-প্যাকড বাণিজ্যিক সিনেমা হলেও ছবির ভেতরে গভীর আবেগ রয়েছে। বাবা-মেয়ের সম্পর্কই ছবিকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করেছে। অনিল কাপুরের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে রাধিকা বলেন, তিনিই ছিলেন সবচেয়ে উদ্যমী। তাঁর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণশক্তি।

ছবির গল্পে কিছু দুর্বলতা থাকলেও অনিল কাপুরের অভিনয়ই প্রাণ। সংলাপ কম, কিন্তু চোখের ভাষা ও উপস্থিতিতে চরিত্রকে শক্তিশালী করেছেন। ৬৯ বছর বয়সে তাঁর অ্যাকশন, দৃঢ়তা ও পর্দা দখলের ক্ষমতা দেখে মনে হয়, ‘অ্যাংরি ইয়াং ম্যান’ বয়স দিয়ে মাপা যায় না। অনিল কাপুর যেন তাই মনে করিয়ে দিয়েছেন।