প্রায় ২৫ বছরের প্রবাসজীবনে উপার্জিত অর্থের অধিকাংশই পরিবার ও সন্তানের চিকিৎসায় খরচ হয়ে যায়। জীবনের এ কঠিন মুহূর্তে একদিন ইউটিউবে দেখেন, অনেকে মাশরুম চাষ করে সফল হচ্ছেন। কৃষি বিভাগের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নিয়ে চাষ শুরু করতেই মাত্র তিন মাসে লাভের মুখ দেখেন। দীর্ঘ প্রবাসের কষ্টকে ছুঁড়ে ফেলে এখন ময়মনসিংহের ভালুকার আশরাফ উদ্দিন মাশরুম চাষে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন।

ভালুকা উপজেলার কাচিনা ইউনিয়নের বাটাজোর গিলাচালা গ্রামের বাসিন্দা আশরাফ উদ্দিন। স্ত্রী ও যমজ সন্তান নিয়ে তাঁর সংসার। তাঁর উৎপাদিত মাশরুম রাজধানীর সুপার শপ থেকে স্থানীয় বাজার পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। তিনি জানান, তাজা মাশরুম ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও শুকনো মাশরুম ১২০০ টাকা কেজিতে যাচ্ছে।

১৯৯৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সিঙ্গাপুরে প্রবাসী ছিলেন আশরাফ উদ্দিন। দেশে ফিরে প্রথমে ড্রাগন ও লেবু চাষ করেন, কিন্তু সাফল্য না পেয়ে প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে কলা চাষ শুরু করেন। ইউটিউব দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে গত বছরের ডিসেম্বর থেকে মাশরুম চাষে হাত দেন।

‘মাশরুম চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে পুষ্টি উন্নয়ন ও দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের’ আওতায় স্থানীয় কৃষি বিভাগ সাভারের মাশরুম উন্নয়ন ইনস্টিটিউট থেকে তাঁকে ১০ দিনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। পরে নিজ উদ্যোগে বাড়িতে চাষ শুরু করেন। বাড়ির আঙিনায় রয়েছে একটি গরুর খামার, যেখানে ৫টি গরু আছে। মাশরুম চাষে সহযোগিতা করছেন অষ্টম শ্রেণির যমজ ছেলে মোহাম্মদ হাসান ও মোহাম্মদ হোসাইন।

২৬ মার্চ দুপুরে কৃষক আশরাফ উদ্দিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, আঙিনার দুটি ঘরে প্রায় ৭০০ প্যাকেটে মাশরুম চাষ চলছে। থরে থরে সাজানো প্যাকেট থেকে সাদা মাশরুম বের হয়েছে। রোদ থাকায় প্যাকেটে পানি ছিটাতে ব্যস্ত ছিলেন তিনি।

কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার কারণ জানতে চাইলে আশরাফ উদ্দিন বলেন, প্রবাসে যাওয়ার আগেও তিনি কৃষিকাজ করতেন। প্রবাসজীবনে উপার্জনের বড় অংশ পারিবারিক জটিলতায় হারিয়ে ফেলেন। যমজ সন্তানের একজনের অসুস্থতায় দেশে ও ভারতে চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়। তাই উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেননি।

আশরাফের ভাষ্য, ‘নিজেকে নতুন করে দাঁড় করাতে কৃষির ওপরই ভরসা করেছি। ইউটিউব দেখে মাশরুম চাষের বিষয়ে আগ্রহী হই। পরে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করি। মাত্র ১৫ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে তিন মাসে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার মতো বিক্রি করেছি।’

মাশরুমের বাজার নিয়ে কিছুটা হতাশা থাকলেও আশা আশরাফ উদ্দিনের। তিনি বলেন, বিদেশে চাহিদা বেশি হলেও দেশে এখনো বাজার তৈরি হয়নি। বিভিন্ন দোকান, ফুটপাত ও পাকোড়ার দোকানে নিজে গিয়ে বিক্রি করছেন। ঢাকায় নিয়ে বিক্রি করেন, শুকনো করে বাজারজাত করেন। তাঁর ভাষায়, ‘মাশরুম নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন। প্রবাসজীবনের কষ্ট ভুলতে চাই এই চাষের মাধ্যমেই।’

আশরাফ উদ্দিনকে নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করছেন ভালুকার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাদ্দাম কাজী। তিনি বলেন, মাশরুম চাষে জমি লাগে না, কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হয় না। এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ খাদ্য। বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর, বিশেষ করে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।

সাদ্দাম কাজী আরও জানান, আখের ছোবড়া ও খড় জীবাণুমুক্ত করে সহজেই মাশরুম চাষ করা যায়। এটি আমিষের ভালো উৎস। তবে অনেকে এখনো মাশরুমকে ‘ব্যাঙের ছাতা’ মনে করেন। তাই গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

ভালুকা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নুসরাত জামান বলেন, মাশরুম বাজারজাতকরণেও সহযোগিতা করা হবে। বিভিন্ন বাজার ও সুপার শপে বিক্রির জন্য কথা বলা হচ্ছে। সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের মাশরুম খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। খাওয়ার আগ্রহ বাড়লে বিক্রিও বাড়বে।