মার্কিন রাজনীতির টানাপোড়েনের মাঝেই ফের রাস্তায় নেমেছেন লাখো মানুষ। সেই প্রতিবাদের ঢেউয়ে যুক্ত হন হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা রবার্ট ডি নিরো। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ‘নো কিংস’ আন্দোলনের সাম্প্রতিক বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে সরাসরি সমালোচনা করেন।
বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের দাবি, প্রায় ৮০ লাখ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন। বড় শহর থেকে শুরু করে ছোট শহর—সবখানেই মানুষের ঢল নামে। নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, আটলান্টা, সান ডিয়েগোসহ একাধিক স্থানে একই ধরনের সুরে গণতন্ত্র রক্ষার আহ্বান জানানো হয়।
আয়োজকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘নো কিংস’ আন্দোলন ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা একধরনের গণপ্রতিরোধ। বিশেষ করে কঠোর অভিবাসননীতি, সামরিক তৎপরতা এবং শাসনব্যবস্থার ধরন নিয়ে ক্ষোভ থেকেই এই বিক্ষোভের সূত্রপাত।
নিউইয়র্কে হাজারো মানুষের ভিড়ে দাঁড়িয়ে রবার্ট ডি নিরো বলেন, ‘ট্রাম্প আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য এক অস্তিত্বগত হুমকি।’ বরাবরের মতো ট্রাম্পের কড়া সমালোচক হিসেবে পরিচিত এই অস্কারজয়ী অভিনেতা এবারও তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
‘নো কিংস’: একটি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে পরিচিত এই আন্দোলন ২০২৫ সালে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শুরুর পর থেকে আরও জোরালো হতে থাকে। বলা হচ্ছে, গত এক বছরে এটি তৃতীয় বড় বিক্ষোভ; আগের দুটির তুলনায় আরও বেশি মানুষ এতে অংশ নিয়েছেন। আন্দোলনের মূল বার্তা হিসেবে উঠে আসে—কোনো একক ব্যক্তির কর্তৃত্ব নয়, জনগণের সম্মতিতেই রাষ্ট্র পরিচালিত হবে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন নির্বাহী ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহার করছে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কাজে লাগাচ্ছে।
এই প্রতিবাদের প্রভাব কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে একই দিনে বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে—আমস্টারডাম, মাদ্রিদ ও রোমেও কর্মসূচি পালিত হয়। রোমে প্রায় ২০ হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে সংহতি প্রকাশ করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকেরই ক্ষোভের বড় জায়গা যুদ্ধ ও অভিবাসন ইস্যুকেন্দ্রিক। সাম্প্রতিক সামরিক পদক্ষেপ এবং অভিবাসন বিষয়ে কঠোর অবস্থান—এ দুটিই তাদের মতে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। অনেকের বক্তব্য, দেশকে আরও গভীর সংঘাতে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। এ প্রসঙ্গে একজন সাবেক সেনাসদস্য বলেন, ‘দেশের সংবিধান হুমকির মুখে। আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।’
ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে অস্কারজয়ী অভিনেত্রী বললেন, ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ান’।
সামনে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এর আগে এ ধরনের বড় জনসমাগম রাজনৈতিক সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে ট্রাম্পের সমর্থকেরা তাঁর নীতিকে সমর্থন দিচ্ছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা সংগঠিত হয়ে রাজপথে নামছেন—ফলে দেশটি এখন গভীর রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে গত শুক্রবার ওয়াশিংটন ডিসির জন এফ কেনেডি সেন্টার ফর দ্য পারফর্মিং আর্টসের সামনে আয়োজিত এক সমাবেশে অংশ নেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী জেন ফন্ডা। তিনি নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান, ‘নীরবতা ভাঙুন’ এবং ‘স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ান’।
জেন ফন্ডার নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মসূচিতে বই নিষিদ্ধ করা, রাজনৈতিক সেন্সরশিপ এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নানা হুমকির অভিযোগ উঠে আসে। সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ফন্ডা বলেন, দেশে বই নিষিদ্ধ করা হচ্ছে, ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর স্মারক সরিয়ে ফেলা হচ্ছে এবং শিল্প–সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থায়ন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এসব প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন ফন্ডা। তাঁর ভাষায়, ‘শিল্পের এই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রটি এখন এমন কিছুর প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পুরো দেশে ঘটছে।’
সূত্র: ইউএস টুডে, এনডিটিভি অবলম্বনে