তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে মুক্তকণ্ঠ ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় নবম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম মজুমদার। আলোচনার বিষয় ছিল ‘আকাশছোঁয়া সাফল্য ফেলে শেকড়ের টানে অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম মজুমদার’।.
‘আমাদের দেশের তরুণেরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। তাঁদের পাশে থাকতে হবে এবং সাহস জোগাতে হবে। তবেই তাঁরা এগিয়ে যেতে পারবে।’ পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন অধ্যাপক ড. মাহবুবুল আলম মজুমদার। পডকাস্ট শোর ধারণ করা পর্বটি প্রচারিত হয় গতকাল শনিবার মুক্তকণ্ঠের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।
পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান মাহবুবুল আলম মজুমদারের দেশে ফিরে আসার গল্প। জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার বাবা দেশের বাইরের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। সে সূত্রেই মূলত আমার দেশের বাইরে বেড়ে ওঠা; কিন্তু ছুটি পেলেই বাবা আমাদের দেশে পাঠিয়ে দিতেন। বাবার দেশের জন্য একটি আলাদা টান ছিল। আর আমরা যখন বাংলাদেশে আসতাম, তখন এখানে আত্মীয়স্বজনের এত ভালোবাসা আর স্নেহ আমাকে অনেক মুগ্ধ করত। সেই থেকেই দেশের প্রতি একটা টান সব সময় ছিল। সবাইকে বলতাম, আমি যখন বড় হব, তখন আমি এখানে চলে আসব।’
.মাহবুবুল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘১৯৮৮ সালে “যদি কিছু মনে না করেন” নামের একটি অনুষ্ঠানে আমি একটি সাক্ষাৎকার দিই। সেখানে আমাকে প্রশ্ন করা হয়—বড় হয়ে আমি কী হতে চাই। সেদিন কিশোর বয়সে আমি খুব সাহস করে বলেছিলাম, পড়াশোনা শেষ করে আমি বাংলাদেশে ফিরে আসব। আমার কাছে এটা একটা বাইন্ডিং প্রমিজের মতো হয়ে যায়। তাই পড়াশোনা শেষ করেই দেশে ফিরে আসি।’
বিদেশের নিশ্চিত ক্যারিয়ার ফেলে দেশে ফিরে আসার আত্মবিশ্বাস কীভাবে পেলেন? সঞ্চালক জানতে চাইলে মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘নোবেল বিজয়ের মতো ব্যক্তিগত অর্জনও একসময় ফিকে হয়ে যায়। আমি চাইলে বিশ্বের যেকোনো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার গড়তে পারতাম; কিন্তু সেটা হতো শুধুই ব্যক্তিগত অর্জন। আমার মূল লক্ষ্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের একটি উচ্চতর স্তরে নিয়ে যাওয়া, একা বড় হওয়ার চেয়ে নিজের কমিউনিটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলা। কারণ, কমিউনিটির সক্ষমতা বৃদ্ধি করাই আমার কাছে প্রকৃত সাফল্য।’
.মাহবুবুল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে প্রফেসর আবদুস সালাম সবচেয়ে বড় একটি উদাহরণ। তাঁকে মানুষ সাধারণত মনে রাখে “স্ট্যান্ডার্ড মডেল” তৈরির জন্য; কিন্তু সেটি ছিল তাঁর সাফল্যের একটি ছোট অংশ মাত্র। তাঁর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব হলো “ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর থিওরেটিক্যাল ফিজিকস (আইসিটিপি)” গড়ে তোলা। এটি একটি বৈশ্বিক হাব হিসেবে কাজ করে, যা উন্নয়নশীল দেশের গবেষকদের পথ দেখায়। এখান থেকে শেখার বিষয় হলো—ব্যক্তিগত ক্যারিয়ারের চেয়ে “প্রতিষ্ঠান” গড়া অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন আনা সম্ভব।’
.প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ অভাবনীয় উন্নতি করেছে, এমনকি ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো উদাহরণও তৈরি করেছে। ২৫২–এর মধ্যে মাত্র ৩ পয়েন্ট পাওয়া একটি দলকে আপনি কীভাবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার জন্য প্রস্তুত করলেন?
উত্তরে মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘এই উন্নতি এক দিনে সম্ভব হয়নি। এটি ধাপে ধাপে উন্নয়নের একটি প্রক্রিয়া। আমি শিক্ষার্থীদের খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করতাম। শুরুতে আমাদের প্রাপ্তি খুব সামান্য ছিল; কিন্তু আমি দমে যাইনি। আমি দেখেছি, আমাদের তরুণেরা অত্যন্ত মেধাবী এবং পরিশ্রমী। বড় সমস্যা হলো সমাজ তাঁদের চারপাশে একটি অদৃশ্য দেয়াল বা বক্স তৈরি করে দেয়। আমি শুধু সেই দেয়ালগুলো ভেঙে তাঁদের ওপর বিশ্বাস রেখেছি। ৩ থেকে ৩০, এরপর ধাপে ধাপে তাঁরা আজ বিশ্বজয়ী।’
.আপনি এমআইটি বা স্টানফোর্ডের মতো মানদণ্ড অনুসরণ করে দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস নেন। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জন্য এই বিশেষ ‘টিচিং কালচার’ কেন এত জরুরি?
সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমাদের দেশের অনেক শিক্ষার্থী মনে করেন শুধু আত্মবিশ্বাসই সব। কারণ, তাঁরা প্রকৃত “উৎকর্ষ” দেখার সুযোগ পায় না। আমি সাধারণত এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে নিবিড়ভাবে পড়াই, যাতে তাঁরা যখন পিএইচডি করতে বিদেশে যাবে, তখন যেন কেমব্রিজ বা এমআইটির ছাত্রদের চেয়ে কোনো অংশে পিছিয়ে না থাকে। ডিগ্রির নামের চেয়ে শিক্ষার “স্ট্যান্ডার্ড” বা মান বজায় রাখা আমার কাছে সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার।’
এরপর সঞ্চালক জানতে চান, বাংলাদেশে গবেষণার পরিবেশ তৈরিতে প্রধান বাধাগুলো কী কী? সরকার এবং বেসরকারি খাত এখানে কী ভূমিকা রাখতে পারে?
উত্তরে মাহবুবুল আলম মজুমদার জানান, ‘বাংলাদেশে গবেষণার প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো ফান্ডিং এবং ম্যানেজমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারকদের উচিত ফ্যাকাল্টিদের জন্য নিয়মকানুন সহজ করা, যাতে তাঁরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়ে গবেষণায় মনোযোগ দিতে পারে। এ ছাড়া আমাদের প্রাইভেট সেক্টরকেও গবেষণায় বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করতে হবে। সরকারকেও সব জায়গায় সামান্য করে বরাদ্দ না দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়গুলোতে বড় আকারে ফোকাস দিতে হবে।’
.প্রাথমিক শিক্ষায় আমাদের শিশুরা অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছে। এই ভিত্তি মজবুত করতে আপনার পরামর্শ কী? জানতে চাইলে মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘প্রাথমিক শিক্ষা হলো মূল ভিত্তি। এখানে আসলে এখন আমাদের দুটি জিনিস দরকার—অনলাইন এডুকেশন এবং নিবিড় শিক্ষক প্রশিক্ষণ। আমাদের শিক্ষকেরা অনেক সময় নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হিমশিম খান। তাই শুধু নামমাত্র ট্রেনিং নয়; বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি ভিশন নিয়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করতে হবে, যাতে তাঁরা আগামীর চ্যালেঞ্জগুলোর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারেন।’
মাহবুবুল আলম মজুমদার আরও বলেন, ‘এ ছাড়া আমাদের শেখানোর পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সিএসই ডিপার্টমেন্টে “ম্যাথ ১০১”-এর মতো বিরক্তিকর কোর্সগুলো ছাত্রদের আমি মজার ছলে শেখাই। এ ছাড়া স্কুলের চার দেয়ালের বাইরে গণিত প্রতিযোগিতা, খেলাধুলা এবং সামাজিক দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দিতে হবে। স্কুল মানেই শুধু পরীক্ষা নয়, এটি হতে হবে শেখার একটি আনন্দদায়ক জায়গা।’
এ বছর একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন মাহাবুবুল আলম মজুমদার। একুশে পদক পাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক বিস্মিত হয়েছি আমার শিক্ষার্থীদের আনন্দ দেখে। আমি একুশে পদক পেয়েছি; কিন্তু সবচেয়ে বেশি খুশি তাঁরা।’
.আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে বাংলাদেশের শিক্ষা খাত নিয়ে আপনার চূড়ান্ত লক্ষ্য কী? আমাদের মেধাবীরা কেন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে এবং তাঁদের ফেরানোর উপায় কী?
মাহবুবুল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা অনেক মেধাবী তৈরি করছি; কিন্তু তাঁরা দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কারণ, এখানে তাঁদের কাজ করার বা ফিরে আসার মতো কোনো উন্নত পরিবেশ নেই। আমার লক্ষ্য হলো বাংলাদেশে এমন একটি উন্নত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে দেশের সেরা ২ শতাংশ মেধাবী আসবে এবং বৈশ্বিক মানের গবেষণা করবে। পৃথিবী দ্রুত বদলে যাচ্ছে—এআই, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ব্লকচেইনের যুগে আমরা যদি আমাদের জনশক্তিকে দক্ষ করতে না পারি, তবে আমাদের এই বিশাল জনসংখ্যা বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। আমি চাই, আমাদের সেরা মেধাবীরা দেশেই সফল হওয়ার সুযোগ পাক।’






