বছরে ৬০০ টাকা দিয়ে দুই লাখ টাকার বিমা-সুবিধাসহ ‘হেলথ কার্ড’ পাচ্ছেন মোটরসাইকেলের চালকেরা। এই কার্ডধারীরা পরিবারের সবার জন্য বিনা মূল্যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার সুবিধা পায়। এ ছাড়া কার্ডধারীরা দুই লাখ টাকার বিমা সুবিধা এবং দুর্ঘটনায় আহত হলে চিকিৎসার খরচ পান।

মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী জাপানি কোম্পানি ইয়ামাহা বাংলাদেশের অফিশিয়াল ডিস্ট্রিবিউটর এসিআই মোটরস ও পালস হেলথকেয়ার লিমিটেড গত নভেম্বরে ‘বাইকার্স কেয়ার’ নামের এই ‘হেলথ কার্ড’ চালু করে। তারা জানিয়েছে, চার মাসে আট হাজারের বেশি মোটরসাইকেলের চালক এই কার্ড নিয়েছেন।

পালস হেলথকেয়ার লিমিটেডের হেড অব বিজনেস অপারেশনস এনামুল কবির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, এখন পর্যন্ত এই সুবিধা শুধু ইয়ামাহা মোটরসাইকেলের চালকদের জন্য। তবে সেটা শিগগিরই সবার জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা আছে। তিনি বলেন, শুধু মোটরসাইকেলের চালকদের জন্য এ ধরনের সুবিধা এই প্রথম। তাঁরা আশা করেন, এটা খুবই জনপ্রিয় হবে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৬৬ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৪৮ লাখ ৭১ হাজার মোটরসাইকেল, যা মোট যানবাহনের প্রায় ৭৪ শতাংশ।

দেশের সড়কে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেল যেমন বেশি, তেমনি মোটরসাইকেলের দুর্ঘটনাও বেশি। সড়ক নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও দুর্ঘটনার কারণ নিয়ে কাজ করা সংস্থা রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ৪০ শতাংশ ছিল মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট।

এসিআই মোটরস ও পালস হেলথকেয়ারের হেলথ কার্ড সুবিধায় গ্রাহক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সপ্তাহে ৭ দিন ২৪ ঘণ্টা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শের সুবিধা পাবেন। এতে দেশব্যাপী ১ হাজার ৮০০-এর বেশি চিকিৎসক ও ১০০টির বেশি নেটওয়ার্ক হাসপাতালে মূল্যছাড়ের সুবিধাসহ দুর্ঘটনা-পরবর্তী শারীরিক ও মানসিক সহায়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

দুর্ঘটনা-পরবর্তী জীবনবিমার সুবিধা দুই লাখ টাকা। মানে হলো, দুর্ঘটনায় বিমাগ্রহীতা মারা গেলে তাঁর স্বজনেরা দুই লাখ টাকা পাবেন। সাধারণ জীবনবিমার সুবিধা এক লাখ টাকা অর্থাৎ দুর্ঘটনার বাইরে অন্য কোনো কারণে বিমাগ্রহীতা মারা গেলে পাওয়া যাবে এক লাখ টাকা।

দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হলে চিকিৎসার খরচ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত, যা নেওয়া যাবে বছরে চারবার। দুর্ঘটনায় সামান্য আহত হলে এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার প্রয়োজন না হলে চিকিৎসার খরচ পাওয়া যাবে ছয় হাজার টাকা পর্যন্ত।

পালস হেলথকেয়ার জানিয়েছে, এ ছাড়া হেলথ কার্ডধারীরা দুর্ঘটনা-পরবর্তী থেরাপি ও মানসিক সহায়তা, বাসায় ওষুধ সরবরাহ, অ্যাম্বুলেন্স সেবা ও আন্তর্জাতিক চিকিৎসাব্যবস্থার সহায়তা সুবিধাও পাবেন।

দেশের বিভিন্ন জেলায় থাকা ইয়ামাহার ১২০টি বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এই হেলথ কার্ড নেওয়া যাবে। পালস হেলথকেয়ার জানিয়েছে, হেলথ কার্ড নিতে গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরসহ কয়েকটি তথ্য লাগে, যা ইয়ামাহার কাছে সাধারণত থাকে। এর বাইরে লাগবে নমিনির নাম, মুঠোফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ইত্যাদি।

হেলথ কার্ডের গ্রাহকদের একজন মো. রাহাদ উল ইসলাম। তিনি একজন ফ্রিল্যান্সার। রাহাদ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, চালুর পরপরই তিনি ৬০০ টাকা দিয়ে হেলথ কার্ড সুবিধাটি নিয়েছেন। এরপর তিনি একবার দুর্ঘটনার শিকার হন। তখন চিকিৎসার খরচ পেয়েছেন। রাহাদ বলেন, বছরে মাত্র ৬০০ টাকা খরচ, যা দিনে এক কাপ চায়ের দামের সমানও নয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বর্তমানে মোটরসাইকেলের চালকেরা মূলত দুই ধরনের বিমা-সুবিধা নেন। একটি হলো, মোটরসাইকেল চুরি ও দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণের বিমা। অন্যটি মোটরসাইকেলের কারণে তৃতীয় কারও সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণের বিমা। চালকের নিজের আর্থিক সুরক্ষা বা চিকিৎসার সহায়তার জন্য বিমা করার প্রবণতা বাংলাদেশে কম।

হেলথ কার্ড মূলত স্বাস্থ্যসেবা ও বিমার একটি প্যাকেজ। এসিআই মোটরসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুব্রত রঞ্জন দাস মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এটা সব বাইকারদের জন্য করতে চাই। এখানে মুনাফার কোনো বিষয় নেই। বরং আমাদের খরচ হয়। এই ব্যয়টা আমরা বাইকারদের জন্য করছি।’ তিনি বলেন, ‘শিগগিরই নতুন আরেকটি প্যাকেজ নিয়ে আসার জন্য আমরা আলোচনা করছি, যেখানে গ্রাহকের দেওয়া টাকার পরিমাণ আরেকটু বেশি হবে এবং সুবিধা ও বিমার অঙ্কের পরিমাণ বেশি হবে।’