সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলা ও অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া মুক্তকণ্ঠ ভবনের ধ্বংসস্তূপকে শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এই দগ্ধ ভবন নিয়ে ‘আলো’ শীর্ষক শিল্প-আয়োজনের শেষ দিন ছিল গতকাল সোমবার।

এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিল্পী, রাজনীতিক, পেশাজীবীসহ অনেক দর্শনার্থী প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন। ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে শিউরে উঠেছেন তাঁরা। কেউ কেউ বলেছেন, ধ্বংসের এ ভয়াবহতা তাঁদের ধারণার চেয়েও বেশি। এটা কোনো সভ্য সমাজ বা সভ্য মানুষের কাজ নয়, এটা উগ্রপন্থী মনোভাবের প্রকাশ। হামলার যথাযথ বিচার দাবি সবাই।

গত ১৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই প্রদর্শনী গতকাল শেষ হয়েছে। শেষ দিনে বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মুক্তকণ্ঠের কার্যালয়ে হামলা চালায় সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীরা। তারা হামলা, লুটপাট চালিয়ে ভবনটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে এ বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ দ্রুতই ঘুরে দাঁড়ায়।

গতকাল দুপুরে বিল্পবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক এসেছিলেন স্ত্রী বহ্নিশিখা জামালীকে সঙ্গে নিয়ে। তিনি বলেন, মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টারসহ যারা মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, তাদের ওপর এ হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট একটি মতাদর্শিক রাজনৈতিক চক্র ছিল, যারা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বা মুক্ত চিন্তার বিরুদ্ধে। হামলায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আহ্বান জানান তিনি।

সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ সমিতির সভাপতি সালাউদ্দিন মোহাম্মদ নোমান প্রদর্শনী দেখে বলেন, ‘বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ভেতরে ধ্বংস এত ভয়াবহ। আমরা এমন ধ্বংস চাই না। কোনো ভালো মানুষ এগুলো করতে পারে না।’

ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রদর্শনী দেখতে আসে একটি প্রতিনিধিদল। মোমিনুল ইসলাম বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠ আক্রান্ত হওয়ার পর পাঠক পত্রিকা পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। আমরা তখন পাঠকদের আশ্বস্ত করেছি বলেছি, দ্রুতই মুক্তকণ্ঠ পাঠকদের কাছে ফিরে আসবে। তা-ই হয়েছে। একদিন পরই মুক্তকণ্ঠ প্রকাশিত হয়েছে।’

প্রদর্শনী দেখতে আসেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সানাউল্লাহ লাবলু। সাংবাদিক দিদার হাসান বলেন, এই হামলার মাধ্যমে প্রগতিশীলদের বিনাশ করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সেটি সম্ভব না, অন্ধকার শেষে আলো আসে।

পুষ্টিবিদ আখতারুন নাহার প্রদর্শনী দেখে বললেন, ‘আমার প্রশ্ন এত আক্রোশ কেন? দল-মত ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু আমরা তো একই দেশের মানুষ। তারা অন্যভাবে প্রতিবাদ করতে পারত। প্রয়োজনে আরেকটি পত্রিকা বের করত। কিন্তু এভাবে পুড়িয়ে দেবে কেন? আমাকে পুড়িয়ে দিলে আমি কি তোমার দলে চলে আসব?’

প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন ক্লোজআপ ওয়ান তারকা মাহদী ফয়সাল। তিনি বলেন, ‘সংবাদপত্র হলো গণমানুষের কণ্ঠস্বর। সেটিকে বন্ধ করে দিতে চাওয়ার যে চেষ্টা সেটা সকলের জন্যই দুঃখের। তবে এই পুড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার পরেও সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর যে শক্তি এবং ইচ্ছা, এটা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এটা আমাদের সবাইকে শক্তি দেয়।’

ভবনের চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছিল, তা প্রদর্শিত হয়েছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর। সেসব ঘুরে ঘুরে দেখেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী বুলবুল ইসলাম এবং তাঁর স্ত্রী নজরুলসংগীত শিল্পী শারমিন সাথী ইসলাম। বুলবুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে এ রকম একটি ধ্বংসযজ্ঞ চালাতে পারে। এটা আসলে খুবই সুপরিকল্পিতভাবে করা হয়েছে। এ ধরনের ঘৃণ্য ঘটনা যেন আর না ঘটতে পারে।’

শারমিন সাথী ইসলাম বলেন, ‘যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। ওরা আসলে আমাদের কণ্ঠকে রোধ করতে চায়। আমাদের চিন্তাকে আটকাতে চায়।’

প্রদর্শনী দেখা শেষে মুক্তকণ্ঠতে হামলার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন বিশ্বব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তা নিলুফার আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ভিডিওতে তাদের সবার চেহারা দেখা গেছে, তাদের ধরা সম্ভব। সরকারের কাছে চাইব দ্রুত তাদের আটক করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হোক।’

প্রদর্শনী দেখে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘এ ঘটনা দেখে আমি ভাষাহীন। বর্বরতা, উচ্ছৃঙ্খলতার ভয়াবহ প্রকাশ ঘটেছে এখানে।’ তিনি আশা করেন, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণেরা সমাজের ভালো দিকগুলো তুলে ধরে সামনে এগিয়ে যাবে।

সন্ধ্যায় প্রদর্শনী দেখতে এসেছিলেন শিল্পী রফি হক। সঙ্গে আসেন চারুকলার শিক্ষার্থী ফাহমিদা আলম। রফি হক বলেন, শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের এই প্রদর্শনী দেখে তিনি শিহরিত হয়েছেন। তাঁর এ কাজটি আন্তর্জাতিক মানের তো বটেই। তিনি আসলে স্থাপনা শিল্পের পথিকৃৎদের একজন।