হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠের ভবনটিতে প্রবেশ করতেই এখনো পোড়া গন্ধ আসে। প্রবেশ করে বাঁ দিকে গেলে কিছু চিত্রকর্ম। একটি চিত্রকর্মে দেখা যায়, পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া একটি ভবন। আরেকটি চিত্রকর্মে ফুটে উঠেছে পোড়া ভবনের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাড়ি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাঁড়িয়ে আছে, আরেকটি চিত্রকর্মে এমনটি উঠে এসেছে।
সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠ ভবনে হয়ে গেল ব্যতিক্রমী শিল্পকর্ম প্রদর্শনী ‘আলো’। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মুক্তকণ্ঠের আক্রান্ত ও অগ্নিদগ্ধ ভবন নিয়ে এই শিল্প-আয়োজনে দর্শনার্থীরা দেখছেন পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, টেবিল, চেয়ার, বই, নথিপত্র ইত্যাদি।
আজ সোমবার সেই প্রদর্শনী দেখতে আসেন সাংবাদিক দিদার হাসান ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সানাউল্লাহ লাভলু। প্রদর্শনী দেখে দিদার হাসান বলেন, ‘আমরা কতটা বর্বর, কতটা মধ্যযুগীয় মানসিকতা ধারণ করি, আমরা কতটা প্রগতিবিরোধী, তার প্রমাণ এই হামলা। এর মাধ্যমে প্রগতিশীলদের বিনাশ করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সেটি সম্ভব নয়, অন্ধকার শেষে আলো আসে।’
অগ্নিকাণ্ডকবলিত ভবনটি নিয়ে শিল্পী মাহবুবুর রহমানের ‘আলো’ নামের এই প্রদর্শনীর সময় দুই দিন বাড়িয়ে চলে আজ ২ মার্চ পর্যন্ত। সর্বস্তরের দর্শকদের জন্য প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত এ শিল্প-আয়োজন।
প্রদর্শনীর ১৩শ ও শেষ দিনে ব্যতিক্রমী এ শিল্পকর্ম ‘আলো’ দেখতে এসেছিলেন সংবাদপত্র হকার্স কল্যাণ সমিতির সভাপতি সালাউদ্দিন মোহাম্মদ নোমান। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, ‘বাইরে থেকে বোঝা যায় না, ভেতরে ধ্বংস এত ভয়াবহ হয়েছে। আমরা এমন ধ্বংস চাই না, ধ্বংসের সঙ্গে নেই, কোনো ভালো মানুষ এগুলো করতে পারে না।’
মুক্তকণ্ঠয় হামলার ফলে সেই রাতে মুক্তকণ্ঠের অনলাইন সংবাদপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। মুক্তকণ্ঠের ২৬ বছরের প্রকাশনার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ১৯ ডিসেম্বর ছাপা পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ থাকে। তবে এই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যেও মুক্তকণ্ঠ ঘুরে দাঁড়ায়। মাত্র ১৭ ঘণ্টার মধ্যে আবার অনলাইন কার্যক্রম শুরু হয়। ২০ ডিসেম্বর সকালে সারা দেশের পাঠকেরা ছাপা পত্রিকা হাতে পেয়ে যান।
ঢাকা সংবাদপত্র হকার্স বহুমুখী সমবায় সমিতির সভাপতি মোমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে প্রদর্শনী দেখতে আসে একটি প্রতিনিধিদল। এরপর মোমিনুল বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠ আক্রান্ত হওয়ার পর পাঠকরা পত্রিকা পাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, আবার পত্রিকা কবে পাবেন, এটা নিয়ে। আমরা তখন পাঠকদের আশ্বস্ত করেছি যে দ্রুতই মুক্তকণ্ঠ পাঠকদের কাছে ফিরে আসবে। তা–ই হয়েছে। মুক্তকণ্ঠকে কেউ আটকাতে পারবে না।’
আজ বিকেলে প্রদর্শনী দেখা শেষে ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘এ ঘটনা দেখে আমি ভাষাহীন, যে বর্বরতা, উচ্ছৃঙ্খলতা, তার ভয়াবহতা প্রকাশ পেয়েছে।’ তিনি আশা করেন, এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তরুণেরা সমাজের ভালো দিকগুলো তুলে ধরে সামনে এগিয়ে যাবেন।
প্রদর্শনীর দোতলায় পোড়া বই প্রদর্শন করা হয়েছে। আগুনে যেসব বই পোড়েনি, সেগুলোই প্রদর্শন করা হয়েছে। অক্ষত বইয়ের প্রদর্শনীতে লেখা ‘এই মহাসাগরে স্নান করে জাগোরে’। দোতলার নথিপত্র, বই, আসবাব, যন্ত্রাংশসহ যাবতীয় ধ্বংসস্তূপের ওপর রয়েছে সাদা কফিন।
প্রদর্শনী দেখে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার বলেন, ‘এটি আমাদের সামষ্টিক ব্যর্থতার একটি চিহ্ন হয়ে উঠেছে। যাঁরা নিরাপত্তা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিলেন, তাঁদের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ঘটনাটিকে কেবল একটি ব্যর্থতা হিসেবে ব্যাখ্যা করে দায় এড়িয়ে যাওয়া গ্রহণযোগ্য মনে হয়নি। বরং অনুশোচনা ও দায়স্বীকারের প্রত্যাশা ছিল।’
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) নামের সংগঠনের সদস্যসচিব শরীফ জামিল প্রদর্শনীতে এসে বলেন, আলোর নিচে যে অন্ধকার, তার পরিচয় এ ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে না পারলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ম্লান হবে।
তৃতীয় তলায় পুড়ে যাওয়া লোহালক্কড় প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি এই ফ্লোরের পোড়া বৈদ্যুতিক তার ও অন্যান্য জিনিসও আছে। ওই সময় মুক্তকণ্ঠের যেসব কর্মী ভবন পুড়তে দেখেছেন, তাঁদের বক্তব্যও প্রদর্শিত হচ্ছে।
মুক্তকণ্ঠকে আক্রান্ত করার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের দাবি করেন গর্জন সমাজকল্যাণ সংস্থার সাধারণ সম্পাদক সানজিদা রহমান। প্রদর্শনী দেখে তিনি বলেন, ‘এ হামলার মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা, অর্জন সবকিছুকেই আমরা প্রশ্নবিদ্ধ করেছি।’
চতুর্থ তলায় প্রদর্শন করা হচ্ছে মুক্তকণ্ঠ ভবনে হামলার ভিডিও চিত্র। সেই সঙ্গে চতুর্থ তলায় উগ্রবাদীরা যে লুটপাট ও ভাঙচুর করেছে, তা–ও প্রদর্শিত হচ্ছে। ভাঙচুর করা ও এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা জিনিসপত্রের ওপর রয়েছে একঝাঁক কবুতর।
প্রদর্শনী দেখে উদীচীর সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, ‘আমার অনুভূতিটা পুড়ে যাওয়া উদীচীর স্মৃতিকে মনে করিয়ে দেয়। মুক্তকণ্ঠ, ডেইলি স্টার, উদীচী, ছায়ানটের ওপর আঘাত প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার তাদের থামায়নি।’ এ ঘটনার বিচার দাবি করে তিনি বলেন, নির্বাচিত সরকারের প্রধান কাজ হবে, এসব হামলার বিচার করা। সামনেও যেন এমন না হয়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
প্রদশর্নী দেখতে আসে গণঅধিকার পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল। সেখানে ছিলেন পরিষদের উচ্চতর পরিষদ সদস্য ও গণমাধ্যম সমন্বয়ক আবু হানিফ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিলু খান, রাজশাহী বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন কবীর, স্বাস্থ্য বিষয়ক সহসম্পাদক রবিউল ইসলাম, কাজী হায়াৎ প্রমুখ।






