মুক্তকণ্ঠ কার্যালয়ে হামলায় ক্ষতবিক্ষত মুক্তকণ্ঠ ভবনের ধ্বংসস্তূপকে শিল্পভাষায় রূপ দিয়েছেন শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমান। তাঁর নির্মিত ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী শুধু একটি স্থাপত্যের ওপর আঘাতের দলিল নয়, বরং অন্ধকারের ভেতর থেকেও সৃজনশীল প্রতিরোধের আলোকবর্তিকা তুলে ধরার এক শিল্পিত প্রয়াস। এই প্রদর্শনী দেখতে এসে নাট্যাভিনেত্রী ত্রপা মজুমদার হামলার ভয়াবহতা নতুনভাবে উপলব্ধি করার পাশাপাশি শিল্পের শক্তিতে আশার দিকনির্দেশনাও খুঁজে পেয়েছেন।

সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার মুক্তকণ্ঠের ভবন নিয়ে আয়োজিত শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী দেখতে এর আগে এসেছিলেন সরকারের প্রতিমন্ত্রী, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী, কূটনীতিক, অভিনয়শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা। পুড়ে যাওয়া কম্পিউটার, যন্ত্রাংশ, ভাঙা আসবাব ও বইপত্রের ধ্বংসাবশেষ দেখে অনেকেই আবেগতাড়িত হয়ে পড়েন। প্রদর্শনী দেখতে আজ শনিবার দুপুরে এসে ত্রপা মজুমদার ও তাঁর স্বামী আপন আহসান এসে বিস্মিত হয়েছেন, মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন, একই সঙ্গে হামলার ভয়াবহতাও উপলব্ধি করেছেন।

দুপুরে এসেছিলেন ত্রপা মজুমদার। তিনি বলেন, ‘মানুষের ক্রোধ কতটা ধ্বংসাত্মক হতে পারে, যেটা চারপাশকে আক্ষরিক অর্থে অন্ধকার করে দেয়। একইভাবে তার বিপরীতে শিল্পীর যে আগুন, তা আলো জ্বালায়, সৃজনশীলতার যে আগুন সেটাই আলো। মাহ্‌বুবুর রহমান যে কাজটা করেছেন, এটি অসাধারণ একটা কাজ। আমাদের তো সুযোগ হয় বিভিন্ন প্রদর্শনী—আমি ব্যক্তিগতভাবে সেই বিষয়গুলো পছন্দ করি, যেটা দর্শককে সম্পৃক্ত করতে পারে। দর্শকের বোধগম্য হয়, দর্শক অনুভব করতে পারে। গোটা ইনস্টলেশনের মধ্যে পুরো মুক্তকণ্ঠ ভবন পুড়িয়ে দেওয়ার ভয়াবহতা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যেটি প্রত্যেক মানুষের হৃদয়ে গিয়ে স্পর্শ করে। এই প্রদর্শনীতে ১৮ ডিসেম্বর রাতের সেই ভয়াবহতা উপলব্ধি করা যায়। মনে হয়েছে, শিল্পীর ভাবনার জায়গাগুলো খুবই চমৎকার ছিল—তিনি যেভাবে ভেবেছেন, কবুতরকে খাঁচায় বন্দী করে দেখিয়েছেন, অভূতপূর্ব। যেভাবে প্রতিটি জিনিস এমনকি ভিডিও প্রেজেন্টেশন এত সৃজনশীল উপায়ে উপস্থাপন করেছেন, মনে হচ্ছে মানুষগুলো ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দাঁড়িয়ে কথা বলছেন।’

কথা প্রসঙ্গে ত্রপা মজুমদার বলেন, ‘আমি যেহেতু নাটকের মানুষ, তাই “নূরলদীনের সারাজীবন” কবিতার লাইন শোনামাত্রই, মনের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। শিল্পী এই প্রদর্শনীতে সৈয়দ শামসুল হকের অসাধারণ সৃষ্টি “নূরলদীনের সারাজীবন” কবিতাকে যেভাবে জায়গা দিয়েছেন, তাতে মনে হয়েছে, ওনার ভাবনা যেমন গভীর, একইভাবে তিনি অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে সেটার বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন।’

অন্ধকার আলোর পথ দেখানো বা আশাহত হওয়ার জায়গা থেকে উঠে দাঁড়ানো, এটাই গণমাধ্যমের কাজ। এমন মন্তব্য করে ত্রপা মজুমদার বলেন, ‘মুক্তকণ্ঠের বৈশিষ্টও তা–ই। আমি সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী ছিলাম। আমার তাই সব সময় মনে হয়েছে, গণমাধ্যমের কাজই হচ্ছে সঠিক পথে সঠিকভাবে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা, পথ দেখানো। সেই জায়গা থেকে মনে হয়েছে, মুক্তকণ্ঠ ভবিষ্যতেও পথ দেখানোর কাজটি করে যাবে।’

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক এই প্রদর্শনী শুরু হয় ১৮ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অগ্নিদগ্ধ ভবনটিতে প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত প্রদর্শনী সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এই প্রদর্শনী চলবে ২ মার্চ পর্যন্ত।