ঢাকা মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী আলফাজ হোসেন চেষ্টা করেও হাসপাতালটির একটি আইসিইউ শয্যার ব্যবস্থা করতে পারেননি। তাঁর চোখের সামনেই ৪০ বছর বয়সী মো. জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন।

আলফাজ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘একিউট নেক্রোটাইজিং প্যানক্রিয়াটাইটিসে আক্রান্ত ছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। মারাত্মক শকে থাকা জাহাঙ্গীর আলমের জন্য আইসিইউ জরুরি ছিল। আইসিইউ পেলে হয়তো বেঁচে যেতেন। অথবা মৃত্যু হলেও এই ব্যক্তির মৃত্যুযন্ত্রণাটা একটু কম হতো। কিন্তু আমি পারিনি।’

গুরুতর অসুস্থতা নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন সাতক্ষীরার জাহাঙ্গীর আলম। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায়ই ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মারা যান তিনি।

.
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এ হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে চার হাজারের বেশি। শিশু ও বড়দের মিলিয়ে মেডিসিন, বার্নসহ ৮টি আইসিইউতে শয্যা আছে ১৪০টি। একটি শয্যার জন্য ৪০ জনের বেশি রোগীর সিরিয়াল থাকে। হাসপাতালে কম করে হলেও ৪০০ আইসিইউ শয্যা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
.

জাহাঙ্গীর আলমের মৃত্যুর খবর দিয়ে মেডিকেল শিক্ষার্থী আলফাজ ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মৃত্যুর আগে তিনি (জাহাঙ্গীর) বলেছিলেন—আমাকে বাঁচাও বাপ…খুব কষ্ট হচ্ছে…একটা আইসিইউ জোগাড় করো।’ ফেসবুক পোস্টে আলফাজ আক্ষেপ করে বলেছেন, তিনি কোনোভাবেই আইসিইউর ব্যবস্থা করতে পারেননি।

.

জাহাঙ্গীর আলম দালালের মাধ্যমে অনেক টাকাপয়সা খরচ করে ২০১৮ সালে মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। তিনি দেশে নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারতেন না। সেখানেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। পেটের গুরুতর সমস্যায় প্রায় এক মাস ধরে পায়খানা বন্ধ ছিল। খাবার খেতে পারতেন না। চিকিৎসার নামে মালয়েশিয়াতেও দালালদের হাতে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। সেখানে টাকা খরচ করেও ঠিকমতো চিকিৎসা পাননি।

কথা হলো জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে ১৮ বছর বয়সী আফজাল হোসেনের সঙ্গে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে সংসারের হাল ধরার জন্য ট্রাক্টর চালানো শুরু করেছেন আফজাল। জানালেন, তাঁর এক ভাইয়ের বয়স ১২ বছর। মা আছেন। তাঁর বাবা নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারতেন না দেশে। তারপর অসুস্থ হয়ে পড়েন। বাবার মালয়েশিয়ায় চিকিৎসার খরচ এবং দেশে আসার পর হাসপাতালে ভর্তিসহ অন্যান্য খরচ মেটানোর জন্য জমি বন্ধক ও গরু বিক্রি করতে হয়েছে।

.
সেই যে আইসিইউর বেডের জন্য সিরিয়াল দিয়ে আসলাম, আজ পর্যন্ত কোনো আইসিইউ থেকে আমার কাছে ফোন আসেনি। আমি ফোনের অপেক্ষায় আছি, ফোন এলে বলব, আর আইসিইউ লাগবে না, রোগী তো মরে গেছে
আলফাজ হোসেন, শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ
.

সাতক্ষীরার বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের আফজাল বলেন, অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই বাবা বাড়ি আসতে চাইতেন। তারপর ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশে ফেরেন। অবস্থা এত খারাপ ছিল যে তাঁকে আর বাড়ি আনা যায়নি। ওই দিন রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে সেখানে তিনি মারা যান।

আফজাল হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, ‘অনেক চেষ্টা করেও বাবার জন্য একটি আইসিইউ জোগাড় করতে পারিনি। তারপর বেসরকারি একটি হাসপাতালে আইসিইউতে ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সেখানে নেওয়ার আগেই বাবা মারা গেছেন।’

.

জটিল, সংকটাপন্ন ও মুমূর্ষু রোগীদের ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) বা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসা দরকার হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২৪ সালের জুন মাসে ‘হেলথ বুলেটিন ২০২৩’ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে মোট ৭২৮টি নতুন আইসিইউ শয্যা স্থাপন করা হয়েছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে আইসিইউ–সম্পর্কিত সর্বেশষ তথ্য এটি। তবে দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোয় মোট আইসিইউ শয্যা কতটি, তা ওই বুলেটিনে উল্লেখ করা হয়নি। তবে ২০২৩ সালের ২৮ এপ্রিল মুক্তকণ্ঠতে ‘২২ জেলায় সরকারিভাবে আইসিইউ সেবা নেই’ শিরোনামের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সারা দেশে সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা ১ হাজার ১২৬টি। বেসরকারি পর্যায়ে এমন শয্যা আছে আরও প্রায় এক হাজার। সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ বিশেষায়িত আইসিইউ সেবার খরচ তুলনামূলক কম হলেও বেসরকারি পর্যায়ের খরচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে।

.

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ২ হাজার ৬০০ শয্যার এ হাসপাতালে রোগী ভর্তি থাকে চার হাজারের বেশি। শিশু ও বড়দের মিলিয়ে মেডিসিন, বার্নসহ ৮টি আইসিইউতে শয্যা আছে ১৪০টি। একটি শয্যার জন্য ৪০ জনের বেশি রোগীর সিরিয়াল থাকে। হাসপাতালে কম করে হলেও ৪০০ আইসিইউ শয্যা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

.

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন চিকিৎসকও নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, আইসিইউতে একজন রোগী ভর্তির পর ওই শয্যা খালি হতে সময় লাগে। আইসিইউর জন্য ১৫০টি আবেদন থাকলে দিনে গড়ে ২০ থেকে ৩০ জনকে ভর্তি করা সম্ভব হয়। আর শুধু এ হাসপাতালের ভর্তি রোগী নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ অনেকের সুপারিশ থাকে বাইরের রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করার জন্য। আইসিইউর জনবলসংকট, যন্ত্রপাতি নষ্ট এসব সমস্যা তো আছেই। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ১০ শতাংশের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা রাখতে হয়। এ মানদণ্ডের অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিক্ষার্থী আলফাজ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দূরসম্পর্কের এক ভাই ফোন করে জাহাঙ্গীর আলমের কথা জানিয়েছিলেন। রোগী হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আসার পর ভর্তির পর থেকে ওষুধ কেনা, বিভিন্ন পরীক্ষা–নিরীক্ষা করা, শয্যার ব্যবস্থা করাসহ সবকিছুতেই যুক্ত ছিলেন তিনি। ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকেরা বারবার রোগীকে আইসিইউতে নেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু তা করা সম্ভব হয়নি।

.
ঢাকা মেডিকেলে আইসিইউ সেবা–সংশ্লিষ্ট একজন চিকিৎসক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শুধু এ হাসপাতালে ভর্তি রোগী নয়, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীসহ অনেকের সুপারিশ থাকে বাইরের রোগীকে আইসিইউতে ভর্তি করার জন্য। আইসিইউর জনবলসংকট, যন্ত্রপাতি নষ্ট এসব সমস্যা তো আছেই। হাসপাতালে ভর্তি রোগীর ১০ শতাংশের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা রাখতে হয়। এ মানদণ্ডের অর্ধেকও পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
.

জাহাঙ্গীর আলমের জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করতে না পারাটা তাঁর ব্যক্তিগত বা একক কোনো চিকিৎসকের ব্যর্থতা নয় বলে উল্লেখ করেন আলফাজ হোসেন। তাঁর মতে, এটা হচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনার অভাব এবং অপর্যাপ্ত বরাদ্দের ফল।

.

আলফাজ হোসেন বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেলের মতো দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতালে ক্রিটিক্যাল রোগীর তুলনায় আইসিইউ বেড অস্বাভাবিকভাবে কম। নিউ বিল্ডিং, বার্ন ইউনিট, ওল্ড বিল্ডিং, সার্জিক্যাল আইসিইউ—সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। রিকোয়েস্ট (অনুরোধ) করেছি, রেফারেন্স দিয়েছি, কিন্তু বারবার শুধু সিরিয়াল লিখে আসছি। অপেক্ষা করেছি কখন একটা বেড খালি হবে, কখন আইসিইউ থেকে কল আসবে।’

রোগীর পরিবারের সামর্থ্য নেই, তা জানার পরও আলফাজ হোসেন বেসরকারি হাসপাতালেও আইসিইউতে শয্যা পাওয়া যায় কি না, সেই চেষ্টা চালাতে থাকেন। কিন্তু ততক্ষণে খবর আসে রোগী মারা গেছেন।

আলফাজ হোসেন বলেন, এই দেশে স্বাস্থ্যসেবা এখনো অধিকারের জায়গায় পৌঁছায়নি। এখানে গরিব মানুষের জীবন কর্পূরের মতো চুপচাপ উড়ে যায়। আপনার বাবা, ভাই, বোন যেদিন আইসিইউর অভাবে মারা যাবে, সেদিন যন্ত্রণাটা বুঝতে পারবেন।

.

শাহীন, জাহাঙ্গীর...এরপর কে?

২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল মুক্তকণ্ঠ অনলাইনে ‘আইসিইউ সংকট-চট্টগ্রাম, ঢাকা ঘুরেও হাসপাতালে ভর্তি করা গেল না শাহীনকে, গেল না বাঁচানো’ শিরোনামের প্রতিবেদনের মাধ্যমে আলোচনায় এসেছিলেন ফেনী সদর উপজেলার মোটবি ইউনিয়নের ৩৮ বছর বয়সী মো. শাহীন। ২৩ এপ্রিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গাছের সঙ্গে ধাক্কায় তাঁর মাথার একাংশ থেঁতলে গিয়েছিল। ২৬ এপ্রিল রাতে শাহীনের স্বজনেরা তাঁকে (মারা যাওয়ার আগের দিন) ঢাকায় এনেছিলেন। মুক্তকণ্ঠের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গুরুতর আহত অবস্থায় শাহীনকে প্রথমে ফেনী শহরের জেড ইউ হাসপাতালে নেওয়া হয়। জীবন বাঁচানোর জন্য এই হাসপাতালের চিকিৎসা-সরঞ্জাম যথেষ্ট ছিল না। অক্সিজেন লাগিয়ে শাহীনকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে জানানো হয়, আইসিইউ শয্যা ফাঁকা নেই। শহরের সিএসটি হাসপাতালে ভর্তি করা হলেও উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা বা অন্য কোথাও নিতে বলা হয়।

ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল থেকেও জানানো হয়, আইসিইউর শয্যা খালি নেই। শাহীনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানেও একই কথা বলা হয়। ধানমন্ডির একটি প্রাইভেট হাসপাতালে আইসিইউ শয্যা খালি থাকলেও রোগীর অবস্থা দেখে তারাও ভর্তি করতে গড়িমসি করে। এ হাসপাতালে এক দিনে চিকিৎসাসহ আনুষঙ্গিক মিলে ৫০-৬০ হাজার টাকা খরচ পড়ে যাবে। অ্যাম্বুলেন্সে করে শাহীনকে নেওয়া হয় ফেনী সদর হাসপাতালে। শাহীনকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামিয়ে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে অক্সিজেন দিয়ে রাখা হয়েছিল, সেখানেই তিনি মারা যান।

১৯ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীর আলম মারা গেছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। গতকাল সোমবার এ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী আলফাজ হোসেন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘সেই যে আইসিইউর বেডের জন্য সিরিয়াল দিয়ে আসলাম, আজ পর্যন্ত কোনো আইসিইউ থেকে আমার কাছে ফোন আসেনি। আমি ফোনের অপেক্ষায় আছি, ফোন এলে বলব, আর আইসিইউ লাগবে না, রোগী তো মরে গেছে।’