সংস্কৃতি বিষয়ে নতুন সরকারের কাছে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র, সংগীত ও নাট্যাঙ্গনের মানুষদের অনেক প্রত্যাশা। তাঁরা চান, স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন কর্মপরিবেশ আর যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন। বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন থেকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও সরকারি অনুদান—বিভিন্ন বিষয়ে আজাদ আবুল কালাম–এর চাওয়া তুলে ধরেছেন মনজুর কাদের
.সংস্কৃতিকর্মী হিসেবে যদি বলি, আমরা এত সংখ্যালঘু হয়ে গেছি, যাদের রাজনীতিতে অভিভাবকত্ব নেই বললেই চলে। নতুন সরকার এই অভিভাবকত্বের জায়গাটা দেখাবে, এমনটাই আশা করব। দেশের সংস্কৃতিকে কীভাবে বিকশিত করা যায়, তারা তা দেখবে। একটা দেশের শিল্প-সাহিত্য, সংস্বৃতি যদি উন্নত না হয়, দেশ পিছিয়ে থাকে—এই বোধোদয় যেন থাকে।
.টেলিভিশন ও বেতারের ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়া বদলানো উচিত। এখানে যাঁরা প্রযোজক হিসেবে কাজ করেন এবং পরিচালক ও উচ্চ পদে যাঁরা আসেন, তাঁরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। স্বায়ত্তশাসনের একটা নীতিমালা আছে, কীভাবে তা আসতে পারে, এটা ভাবা সরকারের দায়িত্ব। এই সরকারও যদি আগের সব সরকারের মতো টেলিভিশন-বেতার থেকে ফায়দা লুটতে চায়, জয়গান শুনতে চায়, তাহলে কখনোই স্বায়ত্তশাসন হবে না। স্বায়ত্তশাসন অনেক বড় সিদ্ধান্ত। এই দিকে তারা যাবে কি না, এটাই বড় বিষয়। বাক্স্বাধীনতা বা ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন—এগুলো যদি সরকার বিশ্বাস করে, তাহলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে স্বায়ত্তশাসনে আনা উচিত।
.সরকারি অনুদানের ক্ষেত্রে যদি বলি, আগে দেখতাম, যারা পেয়েছে, তাদের বেশির ভাগেরই রাজনৈতিক যোগাযোগ আছে। সম্পর্ক বিবেচিত হতো। এই জায়গাগুলোতে নির্মোহ ও নির্লিপ্ত মানুষ দরকার। কে কী রাজনীতি করছে, এটা বিষয় নয়, কনটেন্ট কী এবং যে লোককে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হচ্ছে, সে লোকটার দক্ষতা কী, এটা দেখা উচিত। অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যারা ধারণ করবে না, তাদের প্রথম পর্যায়ে বাদ দিয়ে দিতে হবে। একাত্তরের চেতনা বিক্রির বিষয় নয়, ধারণ করার বিষয়। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা একজন মুক্তিযোদ্ধা। বিএনপি যেহেতু সরকার গঠন করেছে, এ ব্যাপারগুলো মাথায় রাখবে।
.গেল দেড় বছরে শিল্প-সংস্কৃতিতে আমরা যেসব মব দেখেছি, হামলা দেখেছি, তা কিন্তু শেষ হয়নি। আগামী দিনে শক্তভাবে এটাকে প্রতিরোধ করতে হবে। আমরা যারা শিল্প-সংস্কৃতিতে কাজ করি, মুক্তমনে তারা যাতে কাজ করতে পারি, এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেওয়াটা বর্তমান সরকারের দায়িত্ব। বাউল দেখলে যন্ত্রানুষঙ্গ কেড়ে নেওয়া, কনসার্ট পণ্ড করা—এসব মোটেও চলবে না। দেশে এই যে মব তৈরি হয়েছে, এটা কিন্তু বেশি দিনের নয়, ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতন যেমন হয়েছে, তেমনি এর পরে অদ্ভুত একটা উগ্রবাদের বিস্ফোরণও হয়েছে। ছায়ানট, উদীচী, ডেইলি স্টার ও মুক্তকণ্ঠ পুড়িয়ে দিয়েছে। এদের টার্গেট তো বোঝা যায়। নির্বাচনের পরই এরা হাওয়া হয়ে যাবে—এমনটা ভাবা মোটেও উচিত হবে না। যারা এগুলো করেছে, তাদের যথযাথ বিচারের আওতায় আনা সরকারের উচিত। একেবারে শুরু থেকে এসব ব্যাপারে সরকারের কঠোর হওয়া উচিত। মবতন্ত্রের ব্যাপারে সরকারের সাবধান থাকা খুব জরুরি। এই সরকারের পক্ষে সহজেই এগুলো করা সম্ভব। কারণ, তারা মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছে।
.শিল্পকলা একাডেমির ব্যাপারে যদি বলি, শিল্প-সংস্কৃতিতে বাজেট সবচেয়ে কম। ৬৪ জেলায় শিল্প, সাহিত্য, নাচ, গানের অনুষ্ঠান করার অর্থনৈতিক সক্ষমতা শিল্পকলা একাডেমির নেই। এ ক্ষেত্রে বাজেটে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দরকার।
.আর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ক্ষেত্রে বলব, আমাদের এখানে এমন পুরস্কারপ্রাপ্তও আছেন, সবচেয়ে বেশিবার পেয়েছেন, তাঁদের কেউ জুরিবোর্ডেও ছিলেন। নিজের জন্য তো নিয়েছেন ঠিকই, নিকটাত্মীয়ের জন্যও পুরস্কারের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। এমন উদাহরণও আমাদের কাছে আছে। আমি এই সরকারের দায়িত্বশীলদের বলব, এদের চিহ্নিত করা, একই সঙ্গে যোগ্যদের কাজের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা। ও আমার লোক, ও আমার লোক না, এই ভেবে পুরস্কার ভাগাভাগি করা—এসব থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সর্বশেষ একুশেও পদকের ক্ষেত্রে বলব, অন্তর্বর্তী সরকার যে পুরস্কার ঘোষণা করল, সেখানেও মনে হলো প্রভাবিত হয়ে করেছে। যোগ্য মানুষকে বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য মানুষকে একুশে পদক দেওয়া হয়েছে। এসব দিকে নজর দিতে হবে।






