শাহবাগের উত্তাল বিক্ষোভের ভেতর দাঁড়িয়ে সরাসরি সম্প্রচার করছিলাম। হঠাৎ খবর পেলাম প্রথম আলো কার্যালয়ে হামলা হয়েছে। দ্রুত চলে আসলাম কারওয়ান বাজারে আমাদের কার্যালয়ের সামনে। এসে দেখলাম রীতিমতো তাণ্ডব চলছে।

১.

১৮ ডিসেম্বর ২০২৫। রাত তখন ১১টার কাছাকাছি। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর খবরে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষোভ মিছিল আসতে শুরু করে শাহবাগের দিকে। বিক্ষোভকারীদের স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা, বন্ধ হয়ে যায় সব ধরনের যান চলাচল। এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে আমি শাহবাগ ফুটওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে মুক্তকণ্ঠর ফেসবুক পেজে পুরো ঘটনার সরাসরি সম্প্রচার করছিলাম।

.‘মনে হয়েছিল কবরে ঢুকেছি’.

একপর্যায়ে শাহবাগ এলাকায় চরম নেটওয়ার্ক বিভ্রাট দেখা দেয়। ঠিক তখনই মুঠোফোনে একের পর এক কল ও মেসেজ (খুদে বার্তা) আসতে শুরু করে। সরাসরি সম্প্রচার শেষ করে মেসেজগুলো চেক করতেই জানতে পারি, মুক্তকণ্ঠতে হামলা হয়েছে। নেটওয়ার্ক এতটাই দুর্বল ছিল যে অনলাইনে কোনো ভিডিও দেখে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না। তাৎক্ষণিক শাহবাগ থেকে জাতীয় জাদুঘরের দিকে এগিয়ে গিয়ে ফেসবুকে একটি চ্যানেলের মাধ্যমে মুক্তকণ্ঠতে হামলা ও ভাঙচুরের খবরের সত্যতা পাই। হামলার দৃশ্য দেখে মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যাই।

এরই মধ্যে বিক্ষোভকারীরা হ্যান্ডমাইকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ও কারওয়ান বাজারের দিকে যাওয়ার ঘোষণা দেয়। বুঝতে বাকি রইল না যে তাদের পরবর্তী গন্তব্য মুক্তকণ্ঠ। আর দেরি না করে দ্রুত কারওয়ান বাজারের দিকে ছুটতে শুরু করলাম। শাহবাগ মেট্রোস্টেশনের নিচে এসে কিছু অটোরিকশা ছাড়া আর কোনো যানবাহন পেলাম না। অটোরিকশাচালকদের বারবার অনুরোধ করলেও তারা কেউ কারওয়ান বাজারের দিকে যেতে চাইছিল না। এমন পরিস্থিতিতে অনেকটা জোর করে একটি অটোরিকশা নিলাম। গন্তব্য—অফিস।

.চোখের সামনে ভবন পুড়ে অঙ্গার .

অটোরিকশা চলছে ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা যেন তার চেয়েও কয়েক গুণ বেশি বেগে ছুটছিল। তখন সেই সামান্য পথটুকু মনে হচ্ছিল জীবনের দীর্ঘতম কোনো পথযাত্রা। মাথার ভেতর তখন একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—ভেতর থেকে সবাই বের হতে পেরেছে তো? সহকর্মীরা ঠিক আছে তো? ফায়ার সার্ভিস জানতে পেরেছে তো?

আমার পাশে ঠিক তখন বসা ছিলেন অপরিচিত একজন গণমাধ্যমকর্মী। হয়তো আমাকে চিনতেন। আমার তাড়াহুড়া আর নিশ্চুপ অবস্থা দেখে তিনি বললেন, ‘আপনি কি মুক্তকণ্ঠতে কাজ করেন?’ কথাটা শুনে এক মুহূর্তে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। অজানা এক ভয় যেন আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

.মুক্তকণ্ঠের পোড়া ভবনে শিল্পের আলো .

২.

শাহবাগ থেকে ৮-১০ মিনিটের মাথায় পৌঁছে গেলাম কারওয়ান বাজার। সেখান থেকে দ্রুত হেঁটে অফিসের সামনে এসে দেখলাম, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট শেষে পুরো ভবনে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। হামলাকারীরা তখনো সেই জ্বলন্ত ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে নানা স্লোগান দিচ্ছিল। কেউ কেউ তখনো ভবনটিকে লক্ষ্য করে ক্রমাগত ইটপাটকেল ছুড়ে যাচ্ছিল। আমি তখন নিজের পরিচয় গোপন রাখতে মুক্তকণ্ঠর আইডি কার্ডটি লুকিয়ে ফেলি এবং সাধারণ মানুষের মতো মুখে মাস্ক পরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মিশে যাই। জানার চেষ্টা করি—কেন তারা সেখানে বিক্ষোভ করছে, কেন মুক্তকণ্ঠতে আগুন দিয়েছে? কিন্তু তাদের কাছ থেকে কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। সে সময় তারা এতটাই আক্রমণাত্মক ছিল যে কোনো কিছু জানতে চাওয়া বা প্রশ্ন করা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

.

৩.

শাহবাগ থেকে তখন আরও একটি বড় বিক্ষোভ মিছিল এসে জড়ো হয় মুক্তকণ্ঠর সামনে। সেখান থেকে ঘোষণা দেওয়া হয়—তাদের পরবর্তী লক্ষ্য ডেইলি স্টার। এরপর এখানকার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে নিয়ে মুক্তকণ্ঠর মতো ডেইলি স্টার অফিসে গিয়েও তারা নির্বিচার হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালায়। দীর্ঘ সময় ধরে চলে তাদের এই তাণ্ডব। ডেইলি স্টার থেকে আবার মুক্তকণ্ঠর সামনে ফিরে এসে দেখি, বিক্ষোভকারীদের মুহুর্মুহু স্লোগানে এলাকাটি তখনো উত্তাল।

বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, আশপাশে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞ দেখলেও সহিংসতাকারীদের থামাতে কাউকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়নি। সে সময় অগ্নিদগ্ধ ভবনের এবং মুক্তকণ্ঠর ভবনের সামনে বিপরীত পাশে কয়েকজন পুলিশ সদস্যের উপস্থিতি চোখে পড়ে। কিন্তু বিক্ষোভকারীদের আটকানো বা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কোনো চেষ্টাই তাঁদের মধ্যে ছিল না; বরং কয়েকজনকে এই দৃশ্য দেখে রসিকতা করতে দেখা যায়।

.

৪.

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখাও তীব্র হয়ে ওঠে। চোখের সামনেই পুড়ে ছাই হতে থাকে মুক্তকণ্ঠর পাঁচতলা ভবনের ভেতরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সব নথিপত্র আর ফাইল। পুড়তে থাকে ল্যাপটপ, ডেস্কটপ, এসি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও। আর সেই আগুনের নিচে চাপা পড়তে থাকে একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের পরিশ্রম আর সম্পদ। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গণমাধ্যম তখন মুক্তকণ্ঠর সামনে দেশের শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যম পোড়ার দৃশ্য নিজেদের ভিডিও ক্যামেরায় ধারণ করছিল।

তখনো আগুন নেভাতে কোনো ফায়ার সার্ভিস আসেনি। রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে বিজিবি এবং ১টা ২৫ মিনিটে সেনাবাহিনী মুক্তকণ্ঠ ভবনের সামনে এসে পৌঁছায়। তাদের লক্ষ্য করেও বিক্ষোভকারীরা নানা স্লোগান দিতে থাকে। তবে সেনাবাহিনীর অবস্থানের ফলে এলাকার পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা স্বাভাবিক হয়।

.

৫.

রাত দেড়টায় কারওয়ান বাজার মোড় থেকে ফায়ার সার্ভিসের একটি গাড়ি মুক্তকণ্ঠর দিকে আসার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা বাধা দেয়। এ সময় সেনাসদস্যরা নিষেধ করলেও তারা শোনেনি। ফায়ার সার্ভিসের গাড়িটি পরপর দুবার ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। ওদিকে ভবনের ভেতরে বিকট শব্দে এসি ও ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ফাটতে থাকে, আগুনের তীব্রতাও বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি যখন আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছিল, তখন বিষয়টি অফিসের সহকর্মীদের জানাই। তাঁরা ফায়ার সার্ভিসের নম্বর দিয়ে দ্রুত যোগাযোগ করতে বলেন। এরপর ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে কয়েকবার কথা হয় আমার। হামলাকারীদের এড়িয়ে কীভাবে আসা যায়, সেই পথ বাতলে দিচ্ছিলাম। অনেক চেষ্টার পর রাত ২টা ২৬ মিনিটে মুক্তকণ্ঠর সামনে আগুন নেভাতে আসে ফায়ার সার্ভিস, শুরু হয় নির্বাপণকাজ।

.

ভোর সাড়ে চারটার দিকে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলে আমি বাসার উদ্দেশে রওনা হই। এই পুরো সময় ধরে যা ঘটেছে, তার সব ভিডিও ফুটেজ আমি সংরক্ষণ করেছি। যদিও এমন পরিস্থিতিতে কাজ করা মোটেও সহজ ছিল না। তবু হামলাকারীদের লেন্সবন্দী করার এক নেশা আমায় পেয়ে বসেছিল।

*সাহাব উদ্দিন: কনটেন্ট ক্রিয়েটর, প্রথম আলোর ভিডিও বিভাগ