জাতীয় নির্বাচনের পাঁচ দিন আগে গত শনিবার মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মুন্সিকান্দি এলাকায় বিএনপির প্রার্থী ও দলটির বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী–সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় উভয় পক্ষ থেকে গুলি ছোড়া হয়। অস্ত্র হাতে গুলি করা ব্যক্তিদের মধ্যে একরাম দেওয়ানসহ চারজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। দুটি গোয়েন্দা সংস্থার করা তালিকায় ‘শুটার’ হিসেবে নাম রয়েছে একরামের। গতকাল সোমবার পর্যন্ত তাঁকে গ্রেপ্তার করা যায়নি।
ঢাকার আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মোহাম্মদ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলামের বিরুদ্ধে ৯টি হত্যা মামলাসহ ২২টি মামলা রয়েছে। প্রায় ২০ বছর সাজা খেটে ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর জামিনে মুক্ত হন তিনি। পরে আবারও অপরাধে জড়িয়ে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে তালিকায় তাঁর নাম উঠেছে।
গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে পুলিশের তালিকায় নাম থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাইফ মামুনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ হত্যার নেপথ্যে রয়েছে প্রতিপক্ষ সন্ত্রাসী রনির সঙ্গে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব। রনি গ্রেপ্তারে এড়িয়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে আছেন। তাঁর নামও রয়েছে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীর তালিকায়।
শুধু একরাম, সুইডেন আসলাম ও রনি নন, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হোসেন ওরফে পিচ্চি হেলাল, শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ওরফে ইমন, এস এম আরমান, খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসুসহ সারা দেশে প্রায় তিন হাজার অস্ত্রধারী, শুটার, জঙ্গিসহ অপরাধীর তালিকা করা হয়েছে। তালিকাভুক্ত এসব অপরাধী ভোটের মাঠে যাতে সহিংসতা ঘটাতে না পারে, সে জন্য সারা দেশের পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুক্তকণ্ঠকে বলেন, দুটি গোয়েন্দা সংস্থা সম্প্রতি সারা দেশের তিন হাজার অবৈধ অস্ত্রধারী ও অপরাধীর তালিকা করে পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠিয়েছে। তাঁদের মধ্যে ১২৪ জন জঙ্গি এবং ৩৫২ জন ‘শুটার’ রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর ভোটের আগে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর করা তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় নিতে ৬৪ জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) ও আটটি মহানগর পুলিশের কমিশনারকে নির্দেশনা দিয়েছে।
১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগর থানার চন্দ্রিমা উদ্যানের লেকের পাশে অভিযান চালিয়ে জেএমবি সদস্য আহসান জহীর খানকে (৫০) গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাঁর সহযোগীরা পালিয়ে যান। পরে জহীরের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পরদিন ২ ফেব্রুয়ারি তাঁর সহযোগী জেএমবি সদস্য বেলায়েত হোসেন (৩১) এবং ৩ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার করা হয় তোফায়েল হোসেনকে (৩৭)। এ ঘটনায় কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) উপপরিদর্শক (এসআই) মো. আরমান হোসেন শেরেবাংলা নগর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন। এজাহারে বলা হয়, আসামিরা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন অ্যাপের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখত এবং রাষ্ট্রবিরোধী নাশকতার পরিকল্পনা করছিল।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে যারা নানা অপরাধে জড়িয়েছে, অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে যারা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে হামলা করেছে এবং সম্প্রতি বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতায় যাদের কাছে অস্ত্র দেখা গেছে, তাঁদের চিহ্নিত করে তালিকা করা হয়েছে। এর মধ্যে অনেকেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে। কেউ জামিনে আছে, কেউ বা পলাতক।
সূত্রমতে, কোনো প্রার্থীর হয়ে ভোটের মাঠে এসব অপরাধী ও অস্ত্রধারীকে ব্যবহার করা হতে পারে। তাই তালিকায় থাকা অপরাধী ও অস্ত্রধারীদের মধ্যে যারা পলাতক রয়েছে, তাঁদের গ্রেপ্তারে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। যারা জামিনে রয়েছে, তাঁদের ওপর নজর রাখতে বলা হয়েছে। যারা গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছে, তাঁদের বিষয়েও খোঁজখবর রাখতে বলা হয়েছে। তালিকাভুক্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও অবৈধ দখল, অস্ত্র রাখাসহ নানা অভিযোগে মামলা রয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ও সহকারী মহাপরিদর্শক এ এইচ এম শাহাদত হোসাইন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনে সহিংসতা ও নাশকতা ঠেকাতে পূর্ব অপরাধ রেকর্ড ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের নজরদারি করা হচ্ছে। এটি রাজনৈতিক নয়, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, প্রতিরোধমূলক ও আইনসিদ্ধ। উদ্দেশ্য একটাই—অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করা।’
পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভয় এখন জেল পলাতক ও গ্রেপ্তার এড়িয়ে থাকা জঙ্গিরা। ভোটকেন্দ্রের দখল নিতে তাঁরা নাশকতা করতে পারেন, এমন আশঙ্কার কথা জানালেন একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা।
তালিকার তথ্য বলছে, ঢাকা মহানগর এলাকায় অস্ত্রধারী ও অপরাধী রয়েছেন ১১৫ জন, চট্টগ্রাম মহানগরে ১৮০ জন। এ ছাড়া খুলনা মহানগরে ৪২ জন, রাজশাহী মহানগরে ৪০ জন, বরিশাল মহানগরে ১২ জন, গাজীপুর মহানগরে ২০ জন, সিলেট মহানগরে ৯০ জন ও গাজীপুর মহানগরে ২০ জন অস্ত্রধারী ও অপরাধী রয়েছে। এ ছাড়া ৬৪ জেলায় প্রায় আড়াই হাজার অস্ত্রধারী ও অপরাধীর তালিকা করা হয়েছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম ও অ্যান্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনে অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা যাতে কোনো সহিংসতা করতে না পারে, সে জন্য তাঁদের গ্রেপ্তারে থানা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কাজ করছে।
পুলিশের তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের বেশির ভাগেরই রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়নি। ২০ জনের রাজনৈতিক পরিচয় উল্লেখ করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ১৯ জন কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ, যুবলীগের, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মী। অন্যজন চট্টগ্রাম মহানগরের খুলশী থানা ছাত্রদলের সদস্যসচিব।
পুলিশের তথ্য বলছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে গত ৩৬ দিনে চট্টগ্রাম বিভাগে ১৫টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১৩ মাসে রাজনৈতিক বিরোধে চট্টগ্রাম বিভাগে খুন হয়েছেন ১৫ জন। এর মধ্যে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই ১০ জন খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক বিরোধের পাশাপাশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বেও চট্টগ্রামে খুনোখুনির ঘটনা ঘটছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘ফেজ বাই ফেজ (ধাপে ধাপে) অবৈধ অস্ত্রধারী ও অপরাধীদের তালিকা আসছে এবং তা সারা দেশে পাঠিয়ে ব্যবস্থা নিতে বলা হচ্ছে। তালিকায় থাকা অবৈধ অস্ত্রধারীরা সাধারণ হুমকি। তবে নির্বাচনে বড় হুমকি পালিয়ে থাকা ও জামিনে মুক্ত হওয়া ১২৪ জেএমবি সদস্য নিয়ে।’ পালিয়ে থাকা জেএমবি সদস্যদের গ্রেপ্তারে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।






