বিগত ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে সংঘটিত হওয়া গুম, খুন এবং যাবতীয় অন্যায় ও অবিচারের বিচার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

আজ শুক্রবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে ঢাকা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে নবীন আইনজীবীদের জন্য আয়োজিত এক ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রামে প্রধান অতিথির capacity-তে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই কথা উল্লেখ করেন।

অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘যে রক্তাক্ত পথ ধরে আমরা এসেছি, সেই রক্তের পথ অনেক পিচ্ছিল ছিল। বিগত ১৬ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের সাড়ে চার হাজারের বেশি সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি, যাঁদের ক্রসফায়ার করা হয়েছে। আমাদের সাত শর বেশি সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি, যাঁদের গুম করা হয়েছে। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের স্বজনেরা এখনো নামাজ পড়ে জায়নামাজে বসে আল্লাহর কাছে কাঁদেন—কখন তাঁর স্বজন ফিরে আসবেন। আমাদের ৬০ লাখের বেশি নেতা–কর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা গায়েবি মামলা করা হয়েছিল, যাঁদের অনেকেই ঘটনার ২০ বছর আগে মারা গেছেন। আমরা জনগণের কাছে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম যে বাংলাদেশের মাটিতে সব অন্যায়-অবিচারের বিচার করতে চাই। এ ব্যাপারে আমরা বদ্ধপরিকর।’

পেশায় নতুন আসা আইনজীবীদের উদ্দেশ্যে দিকনির্দেশনা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা যাঁরা এই পেশায় এসেছেন, আপনাদের বলব, ছোট বারান্দার আইনজীবী হওয়ার চেষ্টা করবেন না। সব সময় বড় বারান্দার আইনজীবী হিসেবে থাকবেন। ছোট বারান্দা হলো জজ সাহেবদের বারান্দা। ওই বারান্দাতে ঢুকে জজ সাহেবের সঙ্গে লেনদেনের দিকে যাবেন না।’

মো. আসাদুজ্জামান মনে করিয়ে দেন যে, নবীন আইনজীবীরা কোনো ব্যক্তির দয়া কিংবা তদবিরের মাধ্যমে নয়, বরং নিজেদের মেধা, কঠোর শ্রম এবং প্রজ্ঞার জোরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এই সম্মানজনক পেশায় প্রবেশ করেছেন।

আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় প্রভাব বিস্তারের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, এখনো আদালতের সামনে আইনের চেয়ে ক্ষমতার দম্ভ ও দলীয় আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সবাইকে আদালতের সামনে আইনের শাসন ও আইনের কথা তুলে ধরতে হবে।

আইনজীবীদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির বিষয়ে কথা বলে মো. আসাদুজ্জামান জানান, প্রতিটি কোম্পানিতে যেন বাধ্যতামূলকভাবে একজন করে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়, সেই লক্ষ্যে কোম্পানি আইন সংশোধনের বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া সারা দেশের প্রায় ৮০ হাজার আইনজীবীর পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রশিক্ষণের জন্য চলতি বছর মন্ত্রণালয় থেকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

অনুষ্ঠানে আইনজীবীদের পক্ষ থেকে ‘আইনজীবী সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি জানানো হলে মন্ত্রী তার প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, সুরক্ষা আইন করার আগে বার কাউন্সিলের প্রফেশনাল মিসকন্ডাক্ট ট্রাইব্যুনালগুলোকে আরও গতিশীল করতে হবে। দু-একজন আইনজীবীর অনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় যাতে পুরো আইনজীবী সমাজকে বহন করতে না হয়, সেজন্য আগে এই ট্রাইব্যুনালগুলোকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আনোয়ার জাহিদ ভূঁইয়ার সভাপতিত্বে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা-৭ আসনের সংসদ সদস্য হামিদুর রহমান হামিদ, ঢাকার সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মো. রফিকুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. শাহজাহান কবির, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. জাকির হোসাইন, ভারপ্রাপ্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুবুর রহমান, ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি মো. ইকবাল হোসেন, মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি মো. ওমর ফারুক ফারুকী এবং সমিতির সাধারণ সম্পাদক কালাম খান।

পুরো অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা আইনজীবী সমিতির সিনিয়র সহসাধারণ সম্পাদক মো. ইলতুৎমিশ সওদাগর এ্যানী এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন অফিস সেক্রেটারি মো. আবজাল হোসাইন মৃধা।