ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার দৌড়ে বড় ধরনের এগিয়ে গেলেন গাদি আইজেনকট। দেশটির আরব রাজনৈতিক দলগুলো তাঁকে পূর্ণ সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠকে আরব দলগুলোর প্রতিনিধিরা আইজেনকটের প্রতি তাঁদের সমর্থনের কথা জানান। এই সমর্থনের ফলে দেশটির পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন এখন বিরোধী জোটের এই নেতার অনুকূলে। তবে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও আইজেনকটের সম্ভাব্য জোটের অন্তর্ভুক্ত কিছু ইহুদি দলের পক্ষ থেকে তাদের সঙ্গে সরকার গঠনে আপত্তি জানানো হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষ করে প্রেসিডেন্ট হারজগ জানান, মোট ৬৭ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো আইজেনকটকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন প্রদান করেছে। অন্যদিকে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৪৬ জন আইনপ্রণেতার প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো।
যদিও ফলাফলের দিক থেকে চিত্রটি স্পষ্ট, তবে সরকার গঠনের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব অর্পণের আগে দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আরও বিস্তারিত আলোচনা করবেন প্রেসিডেন্ট হারজগ। আগামী রোববার তিনি এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলে জানা গেছে।
এদিকে আইজেনকটের দল ইয়াশার পক্ষ থেকে দ্রুত তাঁকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। দলটির দাবি, ২০১৫ সালের পর কোনো প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী এত বিপুল সংখ্যক আইনপ্রণেতার সমর্থন পাননি।
আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের অধিবেশন বসার কথা রয়েছে, যার পরপরই নতুন স্পিকার নির্বাচন করা হবে। সরকার গঠনের আলোচনা চলমান থাকলেও বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কোনো ধরনের ঐক্য সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে ইয়াশার। দলটির নেতাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের জন্য নতুন নেতৃত্ব এবং একটি স্থিতিশীল সরকার অত্যন্ত প্রয়োজন।
তবে আইজেনকটের সামনে সরকার গঠনের পথটি এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয়। নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো মূলত দুটি ভিন্ন শিবিরে বিভক্ত। এর মধ্যে ইহুদিদের নেতৃত্বাধীন চারটি দলের হাতে রয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে, আরবদের নেতৃত্বাধীন দুটি দল ও জোটের দখলে ১৯টি আসন। যদিও বিরোধীদের সব পক্ষই আইজেনকটকে সমর্থন জানিয়েছে, কিন্তু ইহুদি নেতৃত্বাধীন তিনটি দল এখন পর্যন্ত আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠনে সম্মতি দেয়নি।
আইজেনকটকে সমর্থন দেওয়া আরব দলগুলোর মধ্যে রয়েছে রাআম ও জয়েন্ট লিস্ট। গতকাল প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে রাআমের নেতা মনসুর আব্বাস বলেন, “তিনি আইজেনকটের নেতৃত্বে একটি ভালো সরকার দেখতে চান।”
আব্বাস আরও বলেন, “২০২১ সালে ইয়ার লাপিদ ও নাফতালি বেনেট মিলে যে সরকার গঠন করেছিলেন, নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার—দুই বিবেচনাতেই সেই সরকারের সবচেয়ে খারাপ দিনও বর্তমান কট্টর ডানপন্থী সরকারের চেয়ে অনেক ভালো ছিল।”
তবে আইজেনকটের সরকারে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার একটি শর্ত রয়েছে। বৈঠকে মনসুর আব্বাস সরাসরি হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও সন্ত্রাসবাদ ও রাজনৈতিক সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং হামাসকে নিরস্ত্র করে ক্ষমতা থেকে সরানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
ইসরায়েলি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কোনো সরকার চাইলে রাআম তাতে বাধা হবে না বলে মন্তব্য করেন আব্বাস। তাঁর ভাষায়, “সরকারে রাআমের উপস্থিতির কারণে ইসরায়েলি নাগরিকদের রক্ষায় মন্ত্রিসভা বা সরকার বাধাগ্রস্ত হবে—এমন দাবি সঠিক নয়।”
অন্যদিকে জয়েন্ট লিস্টের নেতা ইউসেফ জাবারিন জানান, ইসরায়েলের আরব নাগরিকেরা বর্ণবাদ, বৈষম্য, অপরাধ এবং রাজনৈতিকভাবে উপেক্ষিত হওয়ার কারণে পরিবর্তন প্রত্যাশা করেন। আইজেনকটের সঙ্গে তাঁদের অনেক বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাঁকে সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁরা।
জয়েন্ট লিস্টের আইনপ্রণেতা আহমেদ তিবি বলেন, তাঁর দল সরকার গঠনে সরাসরি অংশ না নিয়ে বাইরে থেকে সংখ্যালঘু সরকারকে সমর্থন দিতে পারে। তবে সরকারকে শুধু এক-দুই মাস টিকিয়ে রেখে পরে পতনের মুখে ঠেলে দিতে চান না তাঁরা। আগামী নেসেটে দলটির ১১টি আসন থাকবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পার্লামেন্টে তাদের সমর্থন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক বা সংসদীয় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে না।
উল্লেখ্য, গত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট ৫৩টি আসন পেলেও সাত আসনে জয়ী ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সমর্থন দেয়নি। ফলে আইজেনকটের সরকার গঠনের সম্ভাবনায় এক নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।
আগামী ১০ নভেম্বর নতুন নেসেটের অধিবেশন বসার কথা রয়েছে এবং এরপরই নতুন স্পিকার নির্বাচন করা হবে। সরকার গঠনের আলোচনা চললেও নেতানিয়াহুর সঙ্গে ঐক্যের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছে ইয়াশার। দলটির নেতাদের মতে, ইসরায়েলের এখন নতুন নেতৃত্ব ও স্থিতিশীল সরকার প্রয়োজন।