ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে। এই রাজনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছেন ইয়াশার পার্টির নেতা গাদি আইজেনকট। শনিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি স্পষ্ট করে জানান, পার্লামেন্টে বিরোধীদের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত কার্যকর করা হবে।
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে জায়নবাদী নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলো মোট ৪৮টি আসন লাভ করেছে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। বাকি ১৯টি আসন দখল করেছে দুটি আরব দল। কোনো একক পক্ষই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারায় সরকার গঠন প্রক্রিয়া জটিল হয়ে পড়েছে। ঠিক এই সংকটময় মুহূর্তেই বিরোধী জোটের নেতা হিসেবে আইজেনকট তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করলেন।
আইজেনকট তাঁর বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, “পাঁচ লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে ইসরায়েলের মানুষ পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। তাঁরা মূলত ৭ অক্টোবরের ঘটনার জন্য দায়ী সরকার এবং সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক অন্তর্ভুক্তি এড়িয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন।” তিনি আরও জানান, পার্লামেন্টের অধিবেশন শুরু হওয়ার সাথে সাথেই এই জনরায় বাস্তবায়নে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিল উত্থাপন করা হবে। এই বিলগুলোর মধ্যে রয়েছে—২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার আগে ও সময়কার নিরাপত্তা ব্যর্থতা তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন, সবার জন্য বাধ্যতামূলক জাতীয় সেবা চালু করা এবং বিদায়ী সরকারের পাস করা বিতর্কিত বিচার বিভাগ সংস্কার আইন বাতিল করা।
নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর পর বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তাঁর মিত্ররা বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তুলে ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এর কড়া জবাব দিয়ে আইজেনকট বলেন, “সরকার নয়, সরকারের প্রতি জনআস্থা আছে কি না, সেই নিশ্চয়তা দেয় পার্লামেন্ট। তাই নির্বাচনের ফলাফল স্পষ্ট, যদিও কেউ কেউ তা নিয়ে সন্দেহ তৈরির চেষ্টা করছেন।”
এদিকে বিভিন্ন সূত্রে খবর পাওয়া গেছে যে, ক্ষমতায় টিকে থাকার মরিয়া চেষ্টায় নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে পারেন। এই আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করে আইজেনকট বলেন, “নতুন সরকার শপথ নেওয়ার আগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সরাসরি ও তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি দেখা দিলে (যা মোকাবিলায় অপেক্ষা করা সম্ভব নয়) শুধু তখন তিনি সামরিক অভিযানে সমর্থন দেবেন।”
নতুন সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আইজেনকট চারটি নির্দিষ্ট শর্ত সামনে এনেছেন। শর্তগুলো হলো—ইসরায়েলকে ইহুদি, গণতান্ত্রিক, উদার ও সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, দেশটির স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত মূল্যবোধের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া, সব নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা চালু করা এবং হামাসকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি গাজায় সংগঠনটির সামরিক ও শাসনক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। আইজেনকট জানিয়েছেন, এই শর্তগুলো মেনে নিলে যেকোনো নির্বাচিত প্রতিনিধির সঙ্গে কাজ করতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
অন্যদিকে, প্রয়োজনীয় আসন সংখ্যা নিশ্চিত করতে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ বিরোধী শিবিরের সদস্যদের নিজেদের দলে টানার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ করেছে ইয়াশার পার্টি। দলটির দাবি, লিকুদের মন্ত্রী ও আইনপ্রণেতারা ব্যক্তিগতভাবে সদস্যদের ফোন করছেন। এই প্রক্রিয়ায় শিক্ষামন্ত্রী ইয়োভ কিশ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপমন্ত্রী আলমোগ কোহেনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আলমোগ কোহেন এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ভুয়া খবর বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, ইয়াশার পার্টির কোনো সদস্যের সঙ্গে তিনি কথা বলেননি।
শনিবার নতুন সরকার গঠন নিয়ে গাদি আইজেনকটের সঙ্গে বৈঠক করেছেন আরেক প্রভাবশালী বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদ। গত সপ্তাহের নির্বাচনের পর এটিই তাঁদের প্রথম প্রকাশ্যে স্বীকার করা বৈঠক। এছাড়া আগামী ১০ নভেম্বর নতুন পার্লামেন্টের শপথ গ্রহণের সময় বর্তমান স্পিকার আমির ওহানাকে পদ থেকে সরানোর পরিকল্পনা করছে বিরোধী দলগুলো। তবে স্পিকার পদের জন্য বেশ কয়েকটি অনুরোধ পেলেও, এই পদে বসার কোনো ইচ্ছা বা অভিপ্রায় নেই বলে জানিয়েছেন বিরোধী নেতা আভিগদোর লিবারম্যান।